হকারের ক্ষুধা উচ্ছেদে কমে?

কিছুদিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদ অভিযান চলছে। প্রশাসন ‘উপরের নির্দেশ’ দেখিয়ে দোকান সরাতে বলছে, না মানলে পণ্য জব্দ করা হচ্ছে। কোথাও দোকান ভাঙা, কোথাও মালামাল বাজেয়াপ্ত, এমনকি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি স্থায়ী সমাধান, নাকি সাময়িক পদক্ষেপ? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কিছুদিন পরই হকাররা আবার ফিরে আসে। কারণ তাদের বিকল্প জীবিকা নেই। পেটের দায়ে মানুষকে সরানো যায়, থামানো যায় না। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানে, একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি। তারা কেন মফস্বল থেকে রাজধানীতে? খোঁজ নিয়েছেন কেউ? পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গত ১ এপ্রিল থেকে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানে জরিমানা, মালামাল জব্দ এবং কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, হকারদের আর কোনোভাবেই ফুটপাতে বসতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ‘হলিডে মার্কেট’ ও ‘নাইট মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। হকারদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু ফুটপাত দখলমুক্ত করা বা জনদুর্ভোগ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর ভেতরে এক ধরনের নতুন ‘শৃঙ্খলা’ তৈরির প্রক্রিয়া কাজ করছে। উচ্ছেদের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা স্থায়ী হয় না। বরং ধীরে ধীরে দলীয় প্রভাব, পুলিশি তদারকি এবং ‘লাইন’ ও ‘লাইনম্যান’ ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে ওঠে। ফলে হকাররা আবার ফুটপাতে ফিরে আসে, কিন্তু আগের মতো স্বাধীনভাবে নয়। বরং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অধীনে, নির্ধারিত নিয়মে এবং অর্থনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কাশেম কবিরের সঙ্গে আলাপে যে চিত্র উঠে আসে, তা বেশ স্পষ্ট।  সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও, শেষ পর্যন্ত তা একটি অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য কাঠামোয় গিয়ে স্থির হয়। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে ফুটপাতের ব্যবসা পরিচালিত হয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কার্যকর পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না থাকায় একই চক্র বারবার ফিরে আসে। প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন এবং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে, হকাররা আজ অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য ও শক্তিশালী বাস্তবতা। ফুটপাতের এই ব্যবসায় বড় মূলধন লাগে না, উচ্চতর দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ হকার প্রতিদিন তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। মতিঝিল,গুলিস্তান, সদরঘাট, শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন ও নিউ মার্কেটের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশি। আর সারা দেশ মিলিয়ে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ। যা একটি বিশাল সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাস্তবতা হলো, ফুটপাতে হকার বসার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘœ ঘটে তা অস্বীকার করা যায় না। ঢাকার জনসংখ্যার বড় অংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবীর ফুটপাতের বাজারই প্রধান ভরসা। লাখ লাখ হকারও জীবিকার তাগিদে এই পথে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, একজন হকারের মাসিক গড় আয় প্রায় ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার মধ্যে।  যদিও এটি পণ্যের ধরন, অবস্থান ও সময়ের ওপর নির্ভর করে ভিন্নতর হয়। যারা প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন, তাদের আয় তুলনামূলক বেশি। আবার উৎসবের মৌসুমে বিক্রি বাড়ে, ফলে আয়ও বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে  মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে এই আয় নেমে আসে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়।  অর্থাৎ মাসিক ৯,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকার মধ্যে। এই হকাররা শুধু নিজেদের উপার্জনের একটি অংশ নিয়মিত গ্রামে থাকা মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের কাছে পাঠান। ফলে তাদের এই ক্ষুদ্র আয় গ্রামীণ অর্থনীতিকেও সচল রাখতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পণ্যগুলো, যা বড় শপিংমলে জায়গা পায় না, সেগুলোর বাজার তৈরি করে এই হকাররাই। অর্থাৎ তারা শুধু বিক্রেতা নয় বরং একটি বিকল্প অর্থনৈতিক চক্রের ধারক ও বাহক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতে তার বিভিন্ন বক্তব্যে হকারদের বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। হকার পুনর্বাসনের জন্য ৫ বছর মেয়াদি একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব রয়েছে, যাতে এই খাতকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনা যায়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন মার্কেটে,  হকারদের জন্য বিশেষ কর্নার স্থাপন, তরুণ হকারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়টিও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। গত দেড় দশক ধরে ঢাকাসহ সারা দেশে হকারদের বিরুদ্ধে এক নির্মম, অমানবিক ও অসংবেদনশীল উচ্ছেদ অভিযান চলছে। উন্নয়নের নামে, শৃঙ্খলার নামে প্রতিনিয়ত তাদের ওপর নেমে আসছে ভাঙচুর, মালামাল নষ্ট করা, এমনকি মামলা, হয়রানি ও লুটপাটের ঘটনা। স্বল্প পুঁজির হকার এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেলছে তাদের পুঁজি, পণ্য, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার সম্বল। ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ হাইকোর্ট, পুনর্বাসন ছাড়া ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। শুনানিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল সরকার হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিল, যেখানে অস্থায়ী বাজার চালু ও স্থায়ীভাবে বহুতল মার্কেটে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়। হকারদের বৈধতা ও স্বীকৃতি প্রদান জরুরি।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২০-এ ‘কর্মই শক্তি’ নীতির মাধ্যমে কাজের মর্যাদা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী হকারদের শ্রমনির্ভর জীবিকা কোনোভাবেই অবৈধ নয়, বরং তা সম্মান ও সুরক্ষার দাবিদার। অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তবে হকাররা উচ্ছেদ, হয়রানি ও মালামাল নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনায় এই সুরক্ষা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উচ্ছেদ বন্ধ করে ধাপে ধাপে হকারদের পুনর্বাসন একটি মানবিক রাষ্ট্রের উদাহরণ। উন্নয়নের নামে যদি জীবিকা ধ্বংস হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শহরে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা বাজার গড়ে তোলার সফল উদাহরণ রয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, ভারতের দিল্লি, ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে পরিকল্পিত হকার জোন তৈরি করে একদিকে যেমন যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমানো হয়েছে, অন্যদিকে হকারদের জীবিকা নিশ্চিত করা হয়েছে।  চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ ছাড়া মূলত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। হকারদের কাছ থেকে দৈনিক বা সাপ্তাহিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বহু পুরনো। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেছে।  সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইএলও দীর্ঘদিন ধরে শোভন কাজের ধারণা প্রচার করে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিকের মর্যাদা। হকাররা যেহেতু অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, তাই তারা সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাদের জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা সময়ের দাবি। ঋণ ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রান্তিক মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিলে তারা স্বনির্ভর হতে পারে। হকারদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। যদি তারা সহজ শর্তে ঋণ পায়, তাহলে ক্ষুদ্রঋণ ও মহাজনী চক্র থেকে হকাররা বের হয়ে আসতে পারবে।  শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হকারদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা মানে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি উন্নত জীবনের সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে হকারদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ চালু করলে,  তারা তাদের পেশায় দক্ষতা বাড়াতে পারবে এবং প্রয়োজনে বিকল্প পেশায় যেতে পারবে।

হকারদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি একটি কাঠামোগত সমাধানের পথ। এখনো হকারদের জন্য একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা নেই। ফলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়, যা একটি স্থায়ী সমাধান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। একটি সমন্বিত নীতিমালা থাকলে হকারদের নিবন্ধন, স্থান নির্ধারণ, কর ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা একটি কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে। দিন দিন হকার বাড়ছে। নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রাজধানী ঢাকায় এসে আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে নেয়। ফলে ফুটপাতই হয়ে উঠে জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন। হকারদের পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। ‘হকার আইডি কার্ড’ চালু করে প্রকৃত হকারদের তালিকাভুক্ত করা এবং পর্যায়ক্রমে তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি। এতে হকাররা নিয়মিত ভাড়া ও কর প্রদান করে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হতে পারবে এবং বর্তমানে যে অর্থ চাঁদাবাজদের কাছে যায়, তা বৈধভাবে সিটি করপোরেশনের রাজস্বে পরিণত হবে। পুনর্বাসনের অন্তর্বর্তী সময়ে ফুটপাতের একটি অংশে সীমিত আকারে ব্যবসার সুযোগ রেখে পথচারীদের চলাচল কিছুটা স্বস্তিদায়ক করা যেতে পারে। কয়েক বছরের মধ্যে পরিকল্পিত পুনর্বাসন সম্পন্ন হলে  ফুটপাত সম্পূর্ণ হকারমুক্ত করা সম্ভব। হকারদের বৈধ স্বীকৃতি প্রদান, উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ, নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

sk.rafiq1982@gmail.com