পৃথিবী মানুষের অনুপম আবাসস্থল। এখানের প্রতিটি উপাদান মানুষের জীবনধারণকে সহজ ও অর্থবহ করেছে। আলো, বাতাস, পানি, মাটি সবকিছুই যেন এক সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ, যা মানবজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। কিন্তু এই সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের ভেতরেই দেখা দিচ্ছে গভীর অস্থিরতা। আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভোগপ্রবণতা বেড়েছে, কিন্তু কমেছে দায়িত্ববোধ। ফলে পরিবেশ, যা ছিল মানবকল্যাণের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি, সেটিই এখন নানা সংকটে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে, নগরজীবনে এই সংকট সবচেয়ে তীব্রভাবে দৃশ্যমান। বায়ু, পানি ও মাটির দূষণ একসঙ্গে মানুষের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু শারীরিক অসুস্থতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের জীবনমান, আয়ু এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে ইসলামের যে নির্দেশনা ছিল, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিবেশের এমন দুর্দশা হতো না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি এবং এতে পর্বতমালা সৃষ্টি করেছি। আমি পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু সুপরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা হিজর ১৯) কোরআনে আরও বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি দেখো না, নিশ্চয় আসমান ও জমিনের যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।’ (সুরা লোকমান ২০)
উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দুনিয়ার সৃষ্টি এবং দুনিয়ার যাবতীয় উপাদান-উপকরণ আমাদের জন্য পরম নেয়ামত। এগুলোর সংরক্ষণ, যথাযথ ব্যবহার, যতœ ও পরিচর্যা করা ইমানি দায়িত্বের অংশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা সেই ইমানি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারিনি। সেই দায়িত্ব পালন না করায় নানা দূষণের মাধ্যমে আজ আমরা বহুমুখী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। পৃথিবীর শীর্ষ দূষিত শহর ঢাকা। পরিবেশের সব উপাদান-উপকরণ একসঙ্গে দূষিত হয় ঢাকায়। তার মধ্যে ঢাকার বায়ুদূষণ অন্যতম বড় সমস্যা। ঢাকা যেন পৃথিবীর ভূ-নরকে পরিণত হতে যাচ্ছে। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট কর্র্তৃক প্রকাশিত ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকায় বসবাসরত মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় সাত বছর সাত মাস। আর সারা দেশের মানুষের কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট প্লানেটারি হেলথ জার্নালে ‘পলুশন অ্যান্ড হেলথ : আ প্রোগ্রেস আপডেট’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন প্রকার দূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ২ লাখ ১৫ হাজার ৮২৪ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে শুধু বায়ুদূষণের কারণেই সর্বাধিক ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৫ জনের মৃত্যু হয়। দূষণজনিত মৃত্যুর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ পানিদূষণ। প্রতি বছর পানিদূষণে ৩০ হাজার ৮৭৪ জনের প্রাণহানি হয়।
এ ছাড়া অন্যান্য দূষণজনিত মৃত্যুর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সিসাদূষণ। সিসাদূষণের কারণে দেশে ৩০ হাজার ৭৭৭ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া অন্যান্য দূষণে মারা যায় ১০ হাজার ২৮৯ জন। অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা, ঢাকার মতো বড় শহরের চারপাশে ইটভাটা ও কারখানা স্থাপন, শহরের প্রচুর ধুলা এবং নির্মাণকাজ বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। ট্রাফিক জ্যামের কারণে অতিরিক্ত জ্বাালানি খরচও বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচতে মানুষ অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করছে, তাতেও বায়ুদূষণ বাড়ছে। বায়ুদূষণ কমাতে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। বায়ুদূষণের হার কমাতে আমরা যেসব উদ্যোগ নিতে পারি তা হলো অবৈধ ইটভাটা বন্ধের ব্যবস্থা, কারখানাগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া, ট্রাফিক জ্যামের সমাধান, উন্নত জ্বালানি ব্যবহার, এয়ার কন্ডিশনের কম ব্যবহার, আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যান ও পুকুর থাকবে, নিয়ন্ত্রিতভাবে নির্মাণকাজ করা, যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয় এবং প্রচুর বনায়ন করা। কারণ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট বনভূমির আয়তন হচ্ছে প্রায় ১৭.৪ ভাগ। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী যা অর্ধেকেরও কম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইসলাম বৃক্ষরোপণের তাগিদ দিয়েছে। এমনকি হাদিসে বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বুঝাতে হজরত রাসুল (সা.) বলেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে, কেয়ামত এসে গেছে এবং ওই মুহূর্তে গাছের চারা হাতে থাকে আর তা রোপণ করা সম্ভব হয় তাহলে তা রোপণ করে দেবে।’ (মুসনাদে আহমদ)
পানিদূষণ রোধে ইসলাম সবাইকে যথেষ্ট সচেতন ও সতর্ক করেছে। পুকুরের পানি, নদীর পানি, আবদ্ধ জলাশয়ের পানি যেন দূষিত না হয়, সে জন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আবদ্ধ পানি ও জলাশয়ের পানিতে তোমরা প্রস্রাব করবে না।’ (সহিহ মুসলিম) প্রতিটি মানুষের সুস্থতার জন্য পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত পানির প্রয়োজন সর্বাগ্রে। তাই রাসুল (সা.) পানিকে পবিত্র রাখতে এবং পানিকে সংরক্ষণ করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘খবরদার! তোমরা পানির মধ্যে ফুঁ দেবে না।’ (তিরমিজি) এই হাদিসে খাওয়ার পানির কথা বলা হয়েছে। কারণ মানুষের নিঃশ্বাসের সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ সিসাদূষণে চতুর্থ সর্বোচ্চ আক্রান্ত দেশ। ব্যাটারি ভাঙা শিল্প, সিসাযুক্ত পেইন্ট, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল, খাবার রাখার জন্য ব্যবহৃত সিরামিকের পাত্র, ই-বর্জ্য, খেলনা, সার, রান্নায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মসলা, প্রসাধনী, খাবার-দাবার এবং চাষ করা মাছের জন্য তৈরি খাবার থেকে বাংলাদেশে সিসার দূষণ ঘটে। সিসার দূষণরোধে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি করা সময়ের দাবি। ইসলাম যেকোনো দূষণকে নিষেধ করেছে। দূষণ হয়ে গেলে প্রতিরোধ ও শোধন করার নির্দেশনা দিয়েছে। এখন আমাদের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। তাহলে আমরা আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করতে পারব। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক
muftimahbub503@gmail.com