হাতি দম্পতির প্রতি সমানুভূতি

দেশ রূপান্তরের বান্দরবান প্রতিনিধি গত ৩ এপ্রিল ‘মৃত শাবকের পাশে তিন দিন ঠায় দাঁড়িয়ে হাতি দম্পতি’ শিরোনামে প্রকাশিত দুই ইঞ্চির সচিত্র সংবাদে উল্লেখ করেছেন, ‘ঘোলা জলের এক অগভীর ডোবা। নির্জন ডোবার পানিতে পড়ে আছে হাতিশাবকের নিথর দেহ। পাশে বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছে মা হাতি। নিঃশব্দ, স্থির যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে। একটু দূরে ডোবার কিনারে নীরবে পাহারা দিচ্ছে একটি পুরুষ হাতি। গত তিন দিন ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মা ও পুরুষ হাতিটি। মৃত শাবকের কাছ থেকে ক্ষণিকের জন্যও সরে যাচ্ছে না তারা। রাতে পুরুষ হাতিটি খাবারের সন্ধানে জঙ্গলে গেলেও, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসে। এরপর মা হাতিটিও অল্প সময়ের জন্য খাবার খেয়ে ফের ছুটে আসে সন্তানের কাছে। হৃদয়স্পর্শী এ দৃশ্য দূর থেকে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।’ প্রাণিসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের ভালোমন্দ দেখার জন্য ঢাকার তোপখানায় মন্ত্রণালয় থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে দায়িত্বশীলদের কাছে এ সংবাদটি আদৌ পৌঁছেছে কিনা, জানা যায়নি। হাতি দম্পতির শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা হয়তো প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ম্যানুয়ালে নেই। আর ক্ষতিপূরণ? হাতির মতো প্রাণীকে যে সমাজ অধিকাংশ সময় আপদ মনে করে, যে সমাজ তাদের পোষার জন্য বাজেটের টাকা আত্মসাৎ করে তাদের কাছে সন্তানহারা হাতি দম্পতির প্রতি সমানুভূতি কীভাবে বাক্সময় হয়ে উঠবে? যে দেশে স্বয়ং মনুষ্য সমাজে সন্তান হারানোর ঘটনা ঘটছে অবিরত, যেখানে মাতৃস্নেহের কাঙাল হাজার হাজার শিশু সেখানে অগভীর ডোবায় পড়ে শিশু হাতির অকালমৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত হাতি দম্পতির বেদনায় সমব্যথী হওয়া বা প্রকাশের অবকাশ মেলে না। 

প্রাণিসম্পদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন, সুন্দরবনের বাঘ-বানর-হরিণ-কুমির (বাবাহকু)-এর পলিটব্যুরোপ্রধান সুন্দর মিয়া,  দুই রাত ঘুমাতে পারেননি হাতিশাবকের মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকে। এক শোক বাণীতে সুন্দর মিয়া মনুষ্য সমাজের দায়িত্বহীনতার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন ‘সমানুভূতিপ্রবণ না হলে মানুষের মনুষ্যত্ব টিকবে না। এই মানুষই সভ্যতা সৃষ্টি করে, আবার এই মানুষই সভ্যতাকে ধ্বংস করে।’ সুন্দর মিয়া,  সাম্প্রতিককালে মনুষ্য সৃষ্ট মহা হাঙ্গামায় একপক্ষ অপর পক্ষের সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষিতে মন্তব্যটি করেন। সুন্দর মিয়া বাবাহকুর সংসদ ‘বনে জঙ্গলে’র অধ্যক্ষ শিয়ালেন্দু মামাইয়াকে লোকালয়ে হাতিশাবকের অকাল মৃত্যুতে শাবকটির পিতা-মাতার মধ্যে যে তীব্র বেদনাবোধের উদ্রেক হয়েছে,  তা থেকে মানব সম্প্রদায়ের উপলব্ধির কিছু আছে কি না, কেন না উপরিল্লিখিত চলমান হাঙ্গামাকালে বহু শিশুর এবং এমনকি পাশের লোকালয়ে ছোঁয়াচে হাম রোগের বিস্তারে বহু শিশুর মৃত্যু ঘটছে। এ রোগ প্রতিরোধ প্রতিষেধক বিষয়ে দায়দায়িত্ব নির্ধারণে কিছু করণীয় আছে কি না সে ব্যাপারে সংসদে একটি মোশন প্রস্তাব আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। বাবাহকুর মিডিয়া সেল ইতিমধ্যে লোকালয়ে হাতি পোষণ, নিধন, নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কিছু প্রেস কাটিং বনে-জঙ্গলে সংসদ সচিবালয়ে পাঠিয়েছে। বলা হয়েছে ‘রাজধানীর উত্তরায় ট্রেনের ধাক্কায় একটি হাতিশাবকের মৃত্যু হয় বলে বেশ কিছুদিন আগে খবর পাওয়া গিয়েছিল। রেললাইনের পাশে দুটি হাতিকে বেঁধে রেখেছিলেন মাহুত। পরে দুর্ঘটনার শিকার হলে,  মা হাতিটিকে নিয়ে পালিয়ে যায় ওই মাহুত। বিষয়টি নিয়ে থানায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত ওই হাতি বা মাহুতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হাতির মালিককে খোঁজা হচ্ছে। পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ যেন মোটরসাইকেল আরোহী আততায়ীকে পগার পার হতে দিয়ে বলা হচ্ছিল, ‘ধরতে চেয়েছিলাম, পারলাম না’।

এদিকে হাতি মৃত্যুর ঘটনায় বন বিভাগকে দায়ী করছেন পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা। তাদের দাবি, হাতি পোষার অনুমতি দেয় বন বিভাগ। এরপর এসব হাতি কী কাজে ব্যবহার করা হয়, তা খোঁজ রাখার দায়িত্ব বন বিভাগের। কিন্তু বছরের পর বছর এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও, তারা গুরুত্ব দেন না। এমনকি কতগুলো হাতি বন্দিদশায় আছে, তাও জানেন না বন কর্মকর্তারা। পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা বলেন, এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়, এটি স্রেফ হত্যাকা-। নিয়ম অনুযায়ী,  বন্দি হাতি যে শহরে বিচরণ করবে সেটা যে কারণেই হোক, বন কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। তার মানে, নিয়ম অনুযায়ী বন কর্মকর্তার জানার কথা এই হাতি কার? এটা দুর্ঘটনা না। এটা অবহেলায় হত্যা করা হলো। এর দায় বন বিভাগ এবং হাতি মালিকের। একে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা বন বিভাগের কাজ। সংবাদকর্মীরা জানতে পারেন, হাতির বাচ্চাটি যখন ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন তার প্রাণ ছিল। তারা তখন বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তাদের সহযোগিতা পাননি। হাতিটির মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর,  বন বিভাগের লোকেরা সেখানে যায়। পরে হাতিটিকে সরিয়ে নেয়। এই নির্যাতন, চাঁদাবাজি, হাতিকে দিয়ে যথেচ্ছা ব্যবহার বন্ধ করার দাবি তোলা হয়। হাতি পোষার যে আইন আছে, সে আইন সংস্কারকল্পে হাতি মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর আগারগাঁও বন ভবনে প্রধান বন কর্মকর্তার মুখোমুখি হন একদল পরিবেশ আন্দোলন কর্মী। এ সময় হাতি বিষয়ে একগুচ্ছ প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয় প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে। তবে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি। বলেন, ‘বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তারও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বান্দরবানের হাতিশাবকের মৃত্যু এবং হাতি দম্পতির হৃদয়বিদারক অবস্থান নিয়ে সেখানকার বন বিভাগের কারও কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকতে অন্ধ।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) ২০১৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশে হাতি ছিল ২৬৮টি। স্থায়ীভাবে এ অঞ্চলের বাসিন্দা,  এমন হাতি ছাড়া পরিব্রাজক হাতির গড় সংখ্যা ছিল ৯৩। বন্দিদশায়, নিবন্ধিত এমন ৯৬টি হাতি ছিল সে সময়। আইইউসিএনের হিসাবে, ২০১৫ সাল থেকে গত এগারো বছরে মারা গেছে ৮৫টি হাতি। তবে দেশের প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কেবল ২০২০ সালেই ২২ ও ২০২১ সালে ১৬টি হাতি মারা পড়েছে মানুষের হাতে। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন বলছে, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স গ্রহণ না করে কোনো বাঘ বা হাতি হত্যা করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন। এ অপরাধের জন্য জামিন অযোগ্য হবেন এবং তিনি সর্বনিম্ন দুই বছর এবং সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। ২০১৭ সালে আইনটিতে সংস্কার এনে, নতুন বিধিমালা করা হয়। লাইসেন্স ছাড়া হরিণ ও হাতি পালনে জেল-জরিমানার বিধান রেখে  ‘হরিণ ও হাতি লালন-পালন বিধিমালা-২০১৭’ চূড়ান্ত করে সরকার। আগের নীতিমালায় লাইসেন্স নেওয়ার কথা ছিল না। শুধু নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে অনুমোদন নিতে হতো। অনুমোদন না নিলেও কোনো শাস্তির বিধান ছিল না। তবে ব্যক্তিমালিকানা পর্যায়ে হাতি পোষার যে আইন, সেটি বাতিল করা উচিত বলে মনে করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি। তাদের মতে, ‘হাতি মানুষ কেন পুষবে। এখন যারা হাতি পুষছে, তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে হাতি দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি করা আর হাতির ওপর নির্মমতা করা। যাদের কাছে হাতি পুষতে দেওয়া হয়, তারা কতটা যতœ নিয়ে হাতি পোষে সেটা যেহেতু বন বিভাগের দেখভালের সক্ষমতা নেই, তাহলে এই আইন কেন করা হয়েছে? তা ছাড়া যেখানে হাতি বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে, সেখানে হাতি পোষার তো কোনো মানে হয় না। বরং হাতি সংরক্ষণের বিষয়। অবিলম্বে হাতি পোষা আইন বাতিল করা উচিত।’

সমিতির নেতানেত্রীরা যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এদিকটায় ছিলেন তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন কি না জানা যায়নি। এরপর আক্ষেপ প্রকাশ করেন, বাবাহকুর হাতিবিষয়ক মন্ত্রকের উপদেষ্টা বিশিষ্ট হাতিনেত্রী হাতায়ানো হাতিবা। এদিকে দেশে এখন পর্যন্ত কত হাতি ব্যক্তি পর্যায়ে পোষা হয় তার হালনাগাদ তথ্য নেই বন বিভাগের কাছে। তবে শিগগির নতুন হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন প্রধান বন সংরক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজারে যেসব হাতি পোষা হচ্ছে, সেগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় আনার। হাতির যারা মালিক রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলছি। ওনারা সময় চাচ্ছেন, আমরাও সময় দিয়েছি। যেহেতু হাতি লালন-পালনের ক্ষেত্রে দীর্ঘকালের একটি প্রক্রিয়া রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মৌলভীবাজারে হাতির জন্য একটি অরফানেজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটা অনুমোদন হলে ওই অঞ্চলের হাতির জন্য একটি অভয়ারণ্য হবে। শ্রীলঙ্কার দুই বিজ্ঞানী এসেছিলেন কারণ তাদের ওখানেও এ রকম অরফানেজ আছে। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া শেরপুরে হাতির অভয়ারণ্যের কাজ চলছে। মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ। অরফানেজটি যদি হয় আশা করি, হাতি নিয়ে যে সংকটগুলো রয়েছে সেটির সমাধান হবে।’ শোকসন্তপ্ত হাতি দম্পতির প্রতি, সমানুভূতি প্রকাশের আর কীই বা উপায় আছে?

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

mazid.muhammad@gmail.com