ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তেহরানের সামনে এক নতুন পথ উন্মুক্ত করেছে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এই অভিযাগে, ইরানের ওপর কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে একপ্রকার পঙ্গু করে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররাও ধারাবাহিকভাবে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেই চাপ আরও ঘনীভূত করেছে। তবে ৪০ দিনের এই যুদ্ধে ইরানের ট্রাম্প কার্ড ছিল ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ। এই একটি পদক্ষেপে বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে তুলেছিল। একাধিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে ট্রানজিট ফি আদায় শুরু করেছে ইরান- আর এই টোল নেওয়া হচ্ছে চীনের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ। কতগুলো জাহাজ ইউয়ানে টোল মিটিয়েছে, তা নিশ্চিত না হলেও লয়েডস লিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ চীনা মুদ্রায় এই লেনদেন সম্পন্ন করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় ইউয়ানে লেনদেনের বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে। গত বুধবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে ঠিকই, তবে এই অস্থিরতার সুযোগে বিশ্ব অর্থনীতির ব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উগরে দিতে একজোট হয়েছে ইরান ও চীন। তাদের লক্ষ্য একটাইআন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একাধিপত্যের অবসান ঘটানো। বিশ্ববাজারে মোট জ্বাালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশই সরবরাহ করা হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইরানের হাতে। আর সেই ভৌগোলিক অবস্থানের সুবাদেই ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে তুলে ধরার হাতিয়ার পেয়ে গেছে তেহরান ও বেইজিং। এই দুই দেশের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যকে হাতিয়ার করে ইরান ও চীনসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপর অন্যায় রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে ওয়াশিংটন। জেপি মর্গান চেজের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেল বাণিজ্যে লেনদেনের প্রায় ৮০ শতাংশই হয় ডলারে। যদিও এই বিষয়ে তেহরান বা বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তেহরান বুধবার শুধু বলেছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়ে তারা হরমুজে নিরাপদে জাহাজ যাতায়াত নিশ্চিত করবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আল জাজিরাকে বলেন, একদিক থেকে দেখতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রকে চরম অস্বস্তিতে ফেলাই ইরানের লক্ষ্য। এতে ওয়াশিংটনের ক্ষতে নুনের ছিটা পড়বে। তবে অন্যদিক থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউয়ান নিয়ে ইরান যথেষ্ট সিরিয়াস। রোগফ বলেন, চীনও নিজেদের এবং ব্রিকস দেশগুলোর বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে এগোচ্ছে।
আর্থিক দুনিয়ায় ‘বহুমেরু’ ব্যবস্থা : ডলারনির্ভর অর্থব্যবস্থার দৌলতে যুক্তরাষ্ট্র যেসব নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে, ইউয়ান ব্যবহারের ফলে চীন ও ইরান তা সহজেই এড়িয়ে যেতে পারবে। এর পাশাপাশি ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির পর থেকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য যেভাবে বেড়েছে, চীনা মুদ্রায় লেনদেনের ফলে তা আরও সহজ ও সস্তা হয়েছে। ব্রিটেনের কিল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বুলেন্ত গোকায় আলজাজিরাকে বলেন, ওয়াশিংটনের আর্থিক আধিপত্য ও পেট্রোডলারের গুরুত্বের মোকাবিলা করা যে কতটা জরুরি, তা ইরান স্পষ্ট বুঝতে পারছে। তার মতে, বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো এক ‘বহুমেরু আর্থিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা, যেখানে উদীয়মান শক্তিগুলো ডলারের একাধিপত্যকে রুখে দিতে পারবে।
ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন। মূলত ইউয়ানে লেনদেন হওয়ার কারণে বেইজিং তেলের দামে বিশেষ ছাড়ও পায়। বিনিময়ে চীন থেকেও বিপুল পরিমাণে যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক ও শিল্পসামগ্রী আমদানি করে তেহরান। পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে দুই দেশের তেল বাণিজ্যে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান ১২ থেকে ১৩.৭ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যার সিংহভাগই গেছে চীনে। ডলারের লক্ষ্যপূরণে দুর্গম পথ : গদিতে ভাগ বসানোর উচ্চাকাক্সক্ষা চীনের দীর্ঘদিনের। গত কয়েক বছরে গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর মধ্যে ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই বেড়েছে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে যেসব দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে, তারাই চীনা মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে। তবে ডলারের সাম্রাজ্যে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে ইউয়ানকে এখনো দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হবে। ডলারের মতো ইউয়ান কিন্তু অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়। আইএমএফের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর পর্যন্ত বিশ্বের মোট সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রার ৫৭ শতাংশই ছিল ডলারের দখলে। সেই তুলনায় ইউরোর দখলে ছিল ২০ শতাংশ এবং ইউয়ানের ভাগ মাত্র ২ শতাংশ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের মাধ্যমে লেনদেনের হার ছিল ৩.৭ শতাংশ। ২০১২ সালে এই হার ছিল ১ শতাংশেরও কম। হংকংয়ের ন্যাটিক্সিস-এর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, কেবল হরমুজ প্রণালিতে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ালেই বিশ্বকে ‘ডলার-মুক্ত’ করা সম্ভব নয়। তার মতে, এর ফলে জ্বাালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে মাত্র। গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, প্রকৃত অর্থে ডলারের একক আধিপত্য কাটাতে হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাওয়ার বিনিময়ে সৌদি আরব শুধু ডলারে তেল বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার পর থেকেই এ অঞ্চলের দেশগুলো তেলের দাম নির্ধারণে ডলার ব্যবহার করে আসছে।
চীন-ইরানের মিত্রতা : চীন যদি ডলারের বিশ্বজনীন দাপটের সঙ্গে পাল্লা না-ও দিতে পারে, তাতেও তেহরানের খুব একটা দুশ্চিন্তা নেই বলে মনে করেন ব্রাসেলসের ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি-মাকিয়ামা। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের প্রায় সব তেলই কেনে চীন। দু-দেশের বাণিজ্য আদতে ভারসাম্যপূর্ণ। কারণ ইরান তার প্রয়োজনীয় সমস্ত যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য চীনের কাছ থেকেই সংগ্রহ করে, যা অন্য কোথাও পাওয়া তার জন্য কঠিন। লি-মাকিয়ামা আরও বলেন, অতীতে ইউরোপ বা জাপানের মুদ্রা ডলারের জায়গা নিতে পারেনি, কারণ তারা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আমদানির সব চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিল না। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীন এখন বাজারের প্রায় সব চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা রাখে। পরামর্শদাতা সংস্থা ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনবক বলেন, স্বল্পমেয়াদে ডলারের সাম্রাজ্য টলানো অসম্ভব হলেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ইউয়ানের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে খর্ব করবে। তার মতে, এটি কোনো আকস্মিক বদল নয়, বরং ডলারের দাপট ক্রমশ ফিকে হয়ে আসার প্রক্রিয়া।