নববর্ষের সর্বজনীন অনুষ্ঠান

নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ বর্ষপঞ্জি। বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার হলো মাস, সপ্তাহ ও বারে বিভক্ত একটি বছরব্যাপী সারণি। সৌরদিবস হলো আমাদের নাগরিক জীবনের প্রচলিত কাল একক। পৃথিবীর নিজ অক্ষের ওপর একবার ঘুরে এলেই তাকে ধরা হয় এক সৌরদিবস। গ্রেগোরীয় ক্যালেন্ডারের গণনায় সূর্যের মধ্যরাত্রির অবস্থান থেকে পরবর্তী মধ্যরাত্রির অবস্থানে ফিরে আসার সময়কে এক সৌরদিবস বলে।

দিল্লিতে সম্রাট আকবর ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ প্রবর্তন করলে বঙ্গদেশে সেই সূত্র ধরে সূর্যসিদ্ধান্ত ভিত্তিক সৌর বছর ব্যবহার শুরু হয়। বাংলা সনের মূল ভিত্তি ছিল হিজরি সন, কিন্তু গণনা করা হতো সৌরবছর ধরে। বাংলা সন চালু হয় ৯৬৩ হিজরিতে, অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। তাই ৯৬৩ কে বাংলা সন করা হয়, তবে এটিকে সৌরবছর হিসেবে গণনা করা হয়।

গণনা পদ্ধতি অনুসারে পৃথিবীতে প্রধানত তিন শ্রেণির সন দেখতে পাওয়া যায়।

চান্দ্র সন : চন্দ্রের বর্ষ হিসাব অনুযায়ী এই সন প্রতিষ্ঠিত। সাধারণত সাড়ে ২৯ দিনে চান্দ্র মাস। এই হিসাবে ৩৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায় এক চান্দ্র সন হয়। আরবি হিজরি সন এই শ্রেণির সন।

সৌর সন : সূর্যের বার্ষিক গতি অনুযায়ী এই সন গণনা হয়। এ সময় সাধারণত ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টায়। ভারতীয় শকাব্দ এবং বাংলাদেশের বাংলা সন এবং খ্রিস্টাব্দ সৌর সন।

নাক্ষত্র সন : রাশিচক্রের ভেতর দিয়ে চাঁদের সাতাশটি নক্ষত্র পরিক্রমণের হিসাবে নাক্ষত্র সন গণনা করা হয়। জ্যোতিষশাস্ত্রে নক্ষত্র বলতে কিন্তু সাধারণ তারা বোঝায় না। কয়েকটি তারার সমবায়ে একেকটি নক্ষত্র পরিকল্পিত। চাঁদের নক্ষত্রম-ল পরিক্রমা সমাপ্ত হয় মোট সাড়ে ২৯ দিনে। এই সাড়ে ঊনত্রিশ দিনে ত্রিশটি তিথি বা চান্দ্র দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নাক্ষত্র সনে এই ত্রিশ দিনে মাস ধরলে, তিনশ ষাট দিনে এক বছর হয়। চন্দ্রের রাশি পরিক্রমণে সময় লাগে ত্রিশ দিন, পক্ষান্তরে সূর্যের সেখানে লাগে ৩৬৫ দিন, অর্থাৎ এক মাসে সূর্য মাত্র একটি করে রাশি অতিক্রম করে। তাই চন্দ্রের পরিক্রমের সময়কে বলা হয় মাস, আর সূর্যের পরিক্রমের সময়কে বলা হয় বছর।

এক রাশি থেকে সূর্য যে সময়ে পরবর্তী রাশিতে প্রবেশ করে তাকেই সংক্রান্তি বলে। সূর্য, রাশিচক্র বা ক্রান্তি-বৃত্তের ওপর দিয়ে চলতে চলতে যেদিন মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, সেদিন থেকে আমাদের নতুন বছর শুরু হয়। এই দিনটিই পহেলা বৈশাখ। উল্লেখ্য, সংক্রান্তির শুরু হয় মেষ রাশি থেকে এবং তার শেষ হয় মীন রাশিতে। অর্থাৎ মেষ রাশি থেকে আরম্ভ করে মীন পর্যন্ত বারোটা রাশির প্রত্যেকটিতে চলতে যে সময় লাগে তাকেই একেকটি মাস নামে অভিহিত করা হয়। বারো মাসে হয় এক বছর। বাংলা সনের প্রথম দিনটি নতুন বছর শুরুর দিন হিসেবে ধরে যে আনন্দ উৎসব পালিত হয় তাই নববর্ষের অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।

নববর্ষের অনুষ্ঠান

বাংলা নববর্ষের যেসব অনুষ্ঠান স্থান ও পাত্রের ওপর নির্ভর নয়, সেগুলোই সর্বজনীন অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানগুলো কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। এই অনুষ্ঠান হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ নির্বিশেষে এগুলো পালন করে। পহেলা বৈশাখে সাধারণ মানুষ অতীতের সুখ-দুঃখ ভুলে গিয়ে নতুনের আহ্বানে সাড়া দেয়। তারা সে দিন প্রাত্যহিক কাজ থেকে বিরতি নিয়ে ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে, আটপৌরে জামা-কাপড় ছেড়ে ধোপদুরস্থ পোশাক-পরিচ্ছদ পরে, বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনকে অ্যাপায়ন করে। সব কিছু মিলে দেশটা যেন হয়ে উঠে উৎসবমুখর।

বার্ষিক মেলা

বাংলা নববর্ষের সর্বজনীন অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে বার্ষিক মেলা অন্যতম। বাংলাদেশের নানা স্থানে সারা বৈশাখ মাস ধরে বিশেষ করে পহেলা বৈশাখে, বড়-ছোট নানা মেলা বসে। স্থানীয় লোকেরাই এসব মেলার আয়োজন করে থাকে। মেলাগুলোর স্থায়িত্বকাল এক থেকে সাত দিন। উত্তর-বঙ্গের দিনাজপুর জেলার নেকমর্দানের মেলা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে উত্তরবঙ্গে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড় মেলা। এ মেলা এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। এতে উত্তরবঙ্গের হেন বস্তু নেই, যা পাওয়া যায় না। জনসাধারণের আনন্দদানের জন্য নাচ, গান, নাগরদোলা প্রভৃতির আয়োজনও থাকে এ মেলায়।

পুণ্যাহ

পুণ্যাহ বাংলা নববর্ষের আরও একটি সর্বজনীন অনুষ্ঠান। পুণ্যাহ শব্দের মৌলিক অর্থ পুণ্য কাজ অনুষ্ঠানের পক্ষে জ্যোতিষশাস্ত্রানুমোদিত প্রশস্ত দিন। কিন্তু বাংলায় এর প্রচলিত অর্থ জমিদার কর্তৃক প্রজাদের কাছ থেকে নতুন বছরের খাজনা আদায় করার প্রারম্ভিক অনুষ্ঠানসূচক দিন। সাধারণত জমিদার ও বড় বড় তালুকদারের কাছারিতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হতো। অধিকাংশ পুণ্যাহ পহেলা বৈশাখে উদযাপিত হলেও বেশ কিছু পুণ্যাহ সারা মাস ধরে পূর্বনির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠিত হতো। এ দিনে অধিকাংশ প্রজা ভালো কাপড়চোপড় পরে জমিদার-তালুকদার বাড়িতে খাজনা দিতে আসতেন। প্রজারা নতুন বছরের অথবা অতীত বছরের খাজনা আংশিক বা পুরোপুরি আদায় করতেন। কোথাও কোথাও জমিদার তালুকদাররা পান-সুপারি দিতেন আর কোথাও কোথাও মিষ্টিমুখও করাতেন। এ দিন জমিদার-প্রজার সম্বন্ধের দূরত্ব খুব কমে আসত।

হালখাতা

হালখাতার অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখের আরেকটি সর্বজনীন অনুষ্ঠান। আমাদের দেশের সব শ্রেণির ব্যবসায়ীর মধ্যেই এই অনুষ্ঠানটির প্রচলন এখনো বর্তমান। এখনো ব্যবসায়ীদের দোকানগুলো পহেলা বৈশাখে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে পতাকা, লতাপাতা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হয়। এখনো এ দিনে ব্যবসায় কেন্দ্রগুলোতে বেচাকেনার চেয়ে আলাপ-আলোচনা ও সামাজিকতার পরিচয় পাওয়া যায় বেশি। হালখাতা নতুন বাংলা বছরের হিসাব পাকাপাকিভাবে টুকে রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার এক আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ। এতে তাদের কাজ-কারবারের লেনদেন, বাকি-বকেয়া, উসুল-আদায় সব কিছুর হিসাব-নিকাশ লিখে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। নানা কাজ কারবারে তাদের সঙ্গে যারা সারা বছর জড়িত থাকেন অর্থাৎ যারা তাদের নিয়মিত গ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক ও শুভার্থী, তাদেরকে পত্রযোগে অথবা লোক মারফত দাওয়াত দিয়ে দোকানে একত্র করে সাধ্যমতো জলযোগে আপ্যায়িত করা হয়। এ আপ্যায়ন একান্ত সৌজন্যমূলক হলেও, এ সুযোগে অনেকে তাদের বাকি-বকেয়াও শোধ করে দেন, যেন হালখাতায় বাকির ঘরে তাদের নাম স্থান না পায়। নেহাত অসমর্থ না হলে কেউ বাকির ঘরে নাম তুলতে চান না। তাদের কাছে এটা অপমানজনক ব্যাপার।

গম্ভীরা

এটি একটি স্থানীয় অনুষ্ঠান। রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। এখনো রাজশাহী জেলার শহর ও মফস্বল এলাকায় প্রতি বছর বৈশাখ মাসজুড়ে নীরবে গম্ভীরা অনুষ্ঠিত হয়। গম্ভীরা লোকগীতি ও লোকনৃত্যের অনুষ্ঠান। সাধারণত রাতে গম্ভীরার আসর বসে। শ্রমজীবী মানুষের কাজ শেষ হলে এটি শুরু হয় এবং তিন চার ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে। স্থানীয় লোককবিরাই গম্ভীরা গানের রচয়িতা ও গায়ক। বিগত বছরের ভালোমন্দ, সুখ-দুঃখের ঘটনা অবলম্বন করে এই গান রচিত হয় আর দোহারেরা অঙ্গভঙ্গি সহকারে নেচে ও গেয়ে গানের কথার রূপ দেন।

বলীখেলা

এটির প্রচলন কেবল চট্টগ্রাম জেলায় সীমাবদ্ধ। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে সারা মাস ধরে এ জেলার নানা স্থানে ভিন্ন ভিন্ন দিনে বলীখেলার আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও দূরদূরান্তের কুস্তিগীররা কুস্তি লড়ে শারীরিক শক্তির পরিচয় দিয়ে থাকে। বিজয়ী কুস্তিগীরদের কাপড় ও নগদ অর্থে পুরস্কৃত করা হয়। যদিও পহেলা বৈশাখ এ বলীখেলার জন্য প্রশস্ত দিন বলে সাধারণভাবে গণ্য করা হয়, তবে বৈশাখ মাসের যেকোনো দিনে এ খেলা আয়োজিত হতে পারে। প্রত্যেক বলীখেলার সঙ্গে একটা সাময়িক মেলাও বসে থাকে। ঢোলের বাদ্য ও সানাইয়ের সুরে খেলার মাঠ সরগরম থাকে। চট্টগ্রামের বলীখেলার মধ্যে আবদুল জব্বারের বলীখেলাই সবচেয়ে বিখ্যাত। আবদুল জব্বার ছিলেন বিখ্যাত বলী। শেষ বয়সে নিজের নামে বলীখেলার আয়োজন করতেন।

নাগরিক আয়োজন

ষাটের দশক থেকে ছায়ানট রমনা বটমূলে গানের মাধ্যমে বৈশাখী উদযাপন শুরু করে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু করে। এর উদ্যোক্তা ছিল চারুকলার ১৯৮৬ ব্যাচ। এই শোভাযাত্রা পরে নববর্ষ পালনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে পড়ে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এর সূত্রপাত হয় ১৯৮৬ সালে যশোরের চারুপীঠের শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। ১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখে তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই ঢাকা শহরে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু হয়। পরে তা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে প্রসিদ্ধ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এটি পুনরায় আনন্দ শোভাযাত্রা নামে অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর শোভাযাত্রাটি বৈশাখ শোভাযাত্রা নাম ধারণ করে অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নিজস্ব রীতি অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ পালন করে।

লেখক : ফিচার রাইটার