রসহীন শিক্ষা মানব মনে গভীর রেখাপাত করতে পারে না বলে গল্পচ্ছলে শিক্ষাদানের চর্চা প্রাচীনকাল থেকেই। ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষকরাও গল্পচ্ছলে শিক্ষা দেওয়ার এই পদ্ধতির কথা জানতেন। তখন শিক্ষা সুলভ ছিল না। শুধু অভিজাত পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষালয়ের দ্বার উন্মুক্ত ছিল। উন্নততর শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকত রাজপরিবারের সন্তানদের জন্য। তারা যেন রাজ্যশাসনের গুরুদায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করতে পারেন সে জন্য তাদের শিক্ষা দেওয়া হতো বিজ্ঞান, সাহিত্য, হিসাব, অংক, তর্কশাস্ত্র, মনোবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়। তবে এসব বিদ্যা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মাথায় রাখা হতো প্রায়োগিক দিককে। পঞ্চতন্ত্রের উদ্ভব এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই।
প্রাচীনকালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য রামায়ণ ও মহাভারতের মতোই পঞ্চতন্ত্রও একক রচয়িতার সাহিত্যকর্ম নাকি বেশ কয়েকজনের সম্মিলিত সৃষ্টি সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন গবেষকরা। প্রচলিত আছে, রাজা অমরশক্তি তার অপদার্থ সন্তানদের শিক্ষাদান নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। তার দেহত্যাগের পর এই বিশাল রাজ্য ও তার প্রজাদের কী হবে এই ভেবে নিয়ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন। একদিন রাজাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখে, সভাসদরা জিজ্ঞেস করলেন তার মন খারাপের কারণ কী? তখন রাজা বললেন, মূর্খ পুত্রের চেয়ে কোনো পুত্র না থাকাও ভালো। পুত্র জন্ম গ্রহণ করে যদি মরে যায় তাও ভালো, কিন্তু যদি পুত্র মূর্খ হয়ে বেঁচে থাকে তাহলে আজীবন কষ্ট দেবে। পরে রাজা সভাসদদের কাছে পরামর্শ চান, তার এই তিন পুত্রকে রাজসিংহাসনের উপযুক্ত করতে পারে এমন শিক্ষক কি আছেন? সভাসদরা বিষ্ণুশর্মার কথা উল্লেখ করে রাজপুত্রদের শিক্ষার ভার তার ওপর অর্পণ করার পরামর্শ দেন। বিষ্ণুশর্মা তখন আশি বছরের বৃদ্ধ। তিনি রাজাকে এই আশ্বাস দেন, রাজপুত্রদের তিনি ছয় মাসের মধ্যে শাস্ত্রজ্ঞ ও রাজসিংহাসনের যোগ্য করে গড়ে তুলবেন। স্থিতধী বিষ্ণুশর্মা পাঁচটি নীতি বা নিয়মকে শ্রেষ্ঠ নিয়ম মনে করতেন। এই পাঁচটি তন্ত্রতে রাজপুত্রদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে তিনি গল্পের আশ্রয় নেন। এই গল্পগুলোই পঞ্চতন্ত্র হিসেবে সমাদৃত হয়ে আছে। প্রথম তন্ত্র হলো মিত্রভেদ। এই নীতিতে গল্পের মাধ্যমে তিনি শিখিয়েছেন, বন্ধুদের মধ্যে ভেদাভেদ বা বিবাদ হলে কীভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার তিনি একইভাবে শিখিয়েছেন, শত্রুদের মধ্যে মিত্রভাব কীভাবে নষ্ট করে তাদের দুর্বল করে তুলতে হয়। দ্বিতীয় তন্ত্র বা নিয়ম হলো মিত্রপ্রাপ্তি। এই নীতির অন্তর্ভুক্ত গল্পের মাধ্যমে তিনি রাজপুত্রদের শিখিয়েছেন কাদের মিত্র বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। বন্ধুর হতে পারার যোগ্যতা কী, বন্ধুত্ব রক্ষার উপায় কী। তৃতীয় তন্ত্র হলো, কাকোলূকীয়। কাক ও উলূক (পেঁচা)-এর চিরশত্রুতা সম্পর্কে শিক্ষাদানের মাধ্যমে কীভাবে চিরশত্রুর হাত থেকে বাঁচা যায় এবং কৌশলে তাকে পরাজিত করা যায় সে বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। চতুর্থ তন্ত্র হলো, লব্ধ-প্রণাশ। এই তন্ত্রে তিনি শিখিয়েছেন অর্জিত ধন কী কী কারণে হারিয়ে যায়। পঞ্চম তন্ত্র হলো, অপরীক্ষিত কারক। অর্থাৎ যাকে যাচাই করা যায় না বা যে পরীক্ষিত নয়। অন্য অর্থে, যেসব কাজ পরীক্ষার ঊর্ধ্বে। এই পর্বের গল্পগুলোর মাধ্যমে কোন কাজগুলো একেবারে করা উচিত না, বিষ্ণুশর্মা সে শিক্ষাই দিয়েছেন। পঞ্চতন্ত্র রাজপুত্রদের জন্য রচিত হলেও এই শিক্ষা সবার এবং সর্বকালের। এই শিক্ষা আজীবনের।
আগেই বলেছি, বিষ্ণুশর্মা একজন ব্যক্তি নাকি একাধিক ব্যক্তি একটি ছদ্মনামে লিখেছেন তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। একই কথা খাটে, গল্পগুলোর কোন সময়ের সে বিষয়েও। তোমাদের জন্য গল্পগুলো অনুবাদ করেছেন তীর্থপতি দত্ত। বইটি তোমাদের ভালো লাগবে। আর যদি গল্পগুলোর শিক্ষা ধারণ করতে পারো, তাহলে তুমিও হতে পারো রাজগুণে গুণান্বিত।