জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত রাষ্ট্রকে নতুন করে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মানুষ যখন রক্ত দেয়, রাস্তায় নামে, ব্যালটের মাধ্যমে নিজের মত স্পষ্ট করে তখন সেই ভোটকে সাধারণ কোনো আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে, জুলাই ন্যাশনাল চার্টারের পক্ষে নির্বাচন কমিশনের ২৬ ফেব্রুয়ারির সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী ৪,৭২,২৫,৯৮০টি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে; ‘না’ ভোট ছিল ২,১৯,৬০,২৩১। বিএনপিও নির্বাচনী প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিল; তারেক রহমান রংপুরের জনসভায় সরাসরি বলেছিলেন, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি দ্বিতীয় ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ দিতে। এখন যদি সেই রায়কে কার্যত অস্বীকার করা হয়, কিংবা এমন পথে বিষয়টিকে নেওয়া হয়, যাতে জনগণের স্পষ্ট মতামত নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে, তবে সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না, এটি হবে জনগণের প্রকাশ্য ইচ্ছার ওপর রাষ্ট্রীয় অনাস্থার প্রকাশ।
একটি মৌলিক কথা মনে রাখা দরকার। সংবিধান জনগণের জন্য, আইন জনগণের জন্য। জনগণ সংবিধানের দাস নয়; সংবিধান জনগণের রাজনৈতিক চুক্তির লিখিত রূপ। তাই জনগণ যখন ভোটের মাধ্যমে তাদের চাওয়া জানিয়ে দিয়েছে, তখন রাষ্ট্র সেই চাওয়াকে সরাসরি অগ্রাহ্য করতে পারে না। সংসদ গুরুত্বপূর্ণ, আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জনগণের স্পষ্ট মতকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় কৌশল দেখানো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, বরং তাকে অন্তঃসারশূন্য করে। আধুনিক গণতন্ত্রতত্ত্বে consultative referendum অর্থাৎ পরামর্শধর্মী গণভোটকে সংসদের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য একটি রাজনৈতিক জনম্যান্ডেট হিসেবে দেখা হয়। এর মানে হলো, ভোট হয়তো নিজে নিজে সংবিধান বদলে দেয় না, কিন্তু সে রাষ্ট্রকে বলে দেয় জনগণ কোন পথে যেতে চায়। সেই নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করা মানে, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে খাটো করা। এ বিষয়ে বিতর্কে সরকারপক্ষের যুক্তি এখন নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। গত ৩১ মার্চ সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে; কিন্তু এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেও জুলাই চার্টার বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নিয়ে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে কোনো ঐকমত্য হয়নি। ২ এপ্রিল সংসদের বিশেষ কমিটি Referendum Ordinance, অর্থাৎ গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-কে তাৎক্ষণিকভাবে আইনে রূপ না দিয়ে পরে বিল আকারে পুনরায় আনার সুপারিশ করেছে এবং ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সংসদে পতিত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের অধ্যাদেশসহ আরও কয়েকটি অধ্যাদেশ আইনে রূপ পেলেও, গণভোট অধ্যাদেশ তার মধ্যে ছিল না।
অন্যদিকে, এই অধ্যাদেশ ও July National Charter Implementation Order-এর বৈধতা নিয়েও হাইকোর্টে রুল জারি হয়েছে। কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটি, যা আইনের ভাষার চেয়েও বড় হয়ে আমাদের সামনে আসে। জনগণকে আগে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইতে বলা হবে, তারপর সেই ভোটের রাজনৈতিক অর্থ সরিয়ে দেওয়া হবে, এটি জনগণ স্বাভাবিকভাবে নেবে কেন? আইনগত ব্যাখ্যা দিয়ে হয়তো প্রক্রিয়াগত অবস্থান বোঝানো যায়, কিন্তু রাজনৈতিক নৈতিকতার ব্যাখ্যা দিয়ে পুনরুদ্ধার করা যায় না। জনগণের ভোট নেওয়ার পর, বাস্তব রাজনৈতিক অর্থকে অর্থহীন হিসেবে তুলে ধরা-রাষ্ট্রের নিজস্ব ভাষাকে অবিশ্বাস্য করে তোলে। পৃথিবীর ইতিহাস বলে, গণভোটের রায়কে অর্ধেক মানা বা পরে উল্টো পথে হাঁটা, সবসময় বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। ২০১৫ সালে গ্রিসে জনগণ ঋণদাতাদের কঠোর শর্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু সেই ভোটের পর, সরকার শেষ পর্যন্ত আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে কঠিন শর্ত মেনে নেয়। ফল কী হয়েছিল? মানুষের মনে গভীর হতাশা জন্মেছিল। তারা বুঝেছিল, ভোট দিয়েছে জনগণ, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংকট আর ক্ষমতার বাস্তবতা। ২০০৮ সালে আয়ারল্যান্ডে ইউরোপীয় ইউনিয়নের Lisbon Treaty, অর্থাৎ লিসবন চুক্তি নাকচ হয়। পরে আবার ভোট নিতে হয়। ২০১৬ সালে কলম্বিয়ায় শান্তিচুক্তি গণভোটে অল্প ব্যবধানে হেরে যায়, কিন্তু সংশোধিত চুক্তি পরে কংগ্রেসের মাধ্যমে পাস হয়। এসব উদাহরণ আমাদের একটি জিনিস শেখায়। গণভোটের রায় উপেক্ষা করলে তাৎক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান মিলতে পারে, কিন্তু political trust, অর্থাৎ রাজনৈতিক আস্থা ভেঙে যায়। আর একবার সেই আস্থা ভেঙে গেলে, রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন তার মূল্য দিতে হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে legitimacy crisis, অর্থাৎ বৈধতার সংকট, বলা যায়। রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগের যন্ত্র নয়; রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের সম্মতি, অংশগ্রহণ এবং বিশ্বাসের ওপর।OECD-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যেসব নাগরিক মনে করেন সরকারি সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে তাদের মতামতের কিছুটা প্রভাব আছে, তাদের ৬৯ শতাংশ সরকারকে বিশ্বাস করেন।
বিপরীতে, যারা মনে করেন সরকার তাদের কথা শোনে না এবং তাদের মতামতের কোনো কার্যকর প্রভাব নেই, তাদের মধ্যে সরকারকে বিশ্বাস করার হার নেমে আসে ২২ শতাংশে। বাংলাদেশে জুলাইয়ের পর সবচেয়ে বড় যে নৈতিক পুঁজি তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এই বিশ্বাস যে- এবার অন্তত জনগণের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। গণভোটের রায়কে দুর্বল করা মানে, সেই পুঁজিকে নিজ হাতে নষ্ট করা। এটি আস্থার ঘাটতি তৈরি করবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, যাদের বড় অংশ জুলাইয়ের নৈতিক শক্তির বাহক ছিল। বাংলাদেশে এর ফল আরও কয়েকভাবে ভয়াবহ হতে পারে। প্রথমত, এটি নতুন এক রাজনৈতিক নৈরাশ্য তৈরি করবে। মানুষ ভাববে, রাস্তায় নামা বৃথা, ভোট দেওয়া বৃথা, রক্ত দেওয়াও বৃথা, কারণ শেষ পর্যন্ত পুরনো রাজনৈতিক হিসাবই জেতে। দ্বিতীয়ত, এটি পুরনোstatus quo , অর্থাৎ পুরনো বন্দোবস্ত, ফিরিয়ে আনার পথ সহজ করবে। কারণ তখন পরাজিত কর্তৃত্ববাদী শক্তি খুব সহজেই বলতে পারবে যে- পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি সবাই দেয়, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সবাই একই খেলা খেলে। তৃতীয়ত, এতে মেরূকরণ বাড়বে। যারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল, তারা এটিকে কেবল নীতিগত মতভেদ হিসেবে নেবে না; তারা এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদার অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নটি নীতি থেকে সরে গিয়ে কেবল দলীয় লেনদেনের বিষয়ে পরিণত হবে। একবার যদি এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে জনগণের ম্যান্ডেটও দরকষাকষির টেবিলে বদলে ফেলা যায়, তবে ভবিষ্যতের যেকোনো সংস্কার উদ্যোগই দুর্বল হয়ে পড়বে। এখানে আরেকটি বড় নৈতিক অসঙ্গতি আছে। যে দল নিজে মঞ্চে দাঁড়িয়ে “হ্যাঁ” ভোট চেয়েছে, সেই দল পরে যদি সেই “হ্যাঁ” ভোটের পরিণতি থেকে সরে আসে, তবে জনগণের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কি সেই সমর্থন ছিল কেবল নির্বাচনী কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তর আইন দিয়ে দেওয়া যাবে না। এটি রাজনৈতিক চরিত্রের প্রশ্ন, নৈতিক সামঞ্জস্যের প্রশ্ন। বিরোধী দলকে একসময় ‘গুপ্ত’, ‘মুনাফিক’ বা দ্বিমুখী রাজনীতির অভিযোগে আক্রমণ করা হয়েছিল। এখন যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে পরে ‘হ্যাঁ’র রাজনৈতিক ফলকে অস্বীকার করা হয়, তাহলে সেই অভিযোগ উল্টো ফিরে আসতে পারে।
রাজনীতিতে ভাষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। গণভোটকে অন্ধভাবে সর্বময় ঘোষণা করা নয়, আবার তাকে অর্থহীন বানানোও নয়। জনগণের রায়কে রাজনৈতিকভাবে স্বীকার করতে হবে, তারপর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তাকে রূপ দিতে হবে। সংসদ বলতে পারে, কোন অংশ তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের পথে যাবে, কোন অংশে অধিকতর বিতর্ক দরকার, কোন অংশ আলাদা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু শুরুটা হতে হবে একটি স্বীকৃতি দিয়ে। এই স্বীকৃতি ছাড়া সব আইনি ব্যাখ্যাই ঘোলাটে দেখাবে। Rule of law অর্থাৎ আইনের শাসন, কখনোই popular sovereignt অর্থাৎ জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে অস্বীকার করে টিকতে পারে না। বরং আইনের শাসনের সত্যিকারের শক্তি এখানেই যে, আইন জনগণের ঘোষিত ইচ্ছাকে সম্মানজনক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো দলের একক লাভক্ষতির প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটি হলো, জুলাইয়ের পর বাংলাদেশ কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতা গড়বে, নাকি আবারও পুরনো কায়দায় ফিরে যাবে? জনগণ যদি ভোট দিয়ে জানায়, তারা পরিবর্তন চায়, আর রাষ্ট্র যদি বলে সেই পরিবর্তন এখন সুবিধাজনক নয়, তবে তা শুধু একটি গণভোটকে ছোট করে না, পুরো গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতিকেই ছোট করে।
যে রাষ্ট্র জনগণের রায়কে সম্মান করে না, সে রাষ্ট্র একদিন জনগণের আস্থা হারায়। মনে রাখা দরকার, আস্থা হারানো রাষ্ট্র কখনো স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক হয় না। জুলাই আমাদের যে সুযোগ এনে দিয়েছিল, সেটি নষ্ট করার অধিকার কোনো দলের নেই। কারণ এই দেশ রাজনৈতিক দলগুলোর আগে জনগণের, এই সংবিধান শেষ পর্যন্ত জনগণেরই। যদিও বিএনপি নির্বাচনের আগে গণভোট অধ্যাদেশের কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল।
লেখক : প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়