অনিরাপদ খাদ্যপণ্য

সংকট শুধু জনস্বাস্থ্যের নয়, অস্তিত্বেরও  

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

অনিরাপদ খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু, মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি, খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের মিশ্রণ এবং দুর্বল বাজার মনিটরিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষ বিষাক্ত খাবার গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটি কেবল শুধু অপরাধই নয়, নীরব জাতিবিনাশী কাণ্ডও। ভেজাল খাদ্যপণ্য আমাদের সমাজের দীর্ঘকালীন একটি গুরুতর সংকট। ২২ আগস্ট দেশ রূপান্তরে ফের উঠে এসেছে এরই উদ্বেকজনক চিত্র। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুদি দোকান থেকে শুরু করে সুপারশপ সবখানেই চকচকে মোড়কে বিস্কুট, চকোলেট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপসসহ বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকসের সম্ভারে ভরপুর। এসব খাবারের দাম কম, সহজলভ্য, বিজ্ঞাপনও আকর্ষণীয়। বিশেষ করে শিশুদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করেছে মনোলোভা মোড়কের খাবার। তবে মোড়কের ভেতরেই বিদ্যমান স্বাস্থ্যঝুঁকির উপাদান। নির্ভেজাল কিংবা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ নয়, এমন কোনো খাদ্যপণ্য আছে কিনা এ নিয়ে সংশয় আছে।

খাদ্য বলতে বোঝায় নিরাপদ খাদ্যবস্তু, অনিরাপদ-ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য নয়। খাদ্য ও বিষযুক্ত খাদ্য একেবারেই সম্পূর্ণ দুই জিনিস। এক শিশি বিষ খাইয়ে কাউকে নিমেষে হত্যা করা আর বিন্দু বিন্দু বিষ খাইয়ে কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি? যদি এ নিয়ে বিশ্লেষণমূলক বিতর্ক হয় তাহলে বলা যায়, পার্থক্য শুধু এটুকু প্রথমটিকে আমরা বলব হত্যা আর দ্বিতীয়টিকে বলব নীরব গণহত্যা। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, খাদ্যপণ্যে ভেজাল নির্মূলে বিভিন্ন সময়ে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে, বিভিন্ন দণ্ডে ভেজালকারীদের তাৎক্ষণিক দণ্ডিতও করা হয়েছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা উৎপাদন কেন্দ্র সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারপরও জীবনবিনাশী অপকাণ্ডের পথ রুদ্ধ করা যায়নি! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণার বরাত দিয়ে দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ। জনস্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকরা দেশে অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের হার বেড়ে চলার পেছনে অনিরাপদ খাদ্যপণ্যের ভূমিকার কথা জানিয়েছেন।

গাণিতিক হিসাবে-সমীকরণে ভেজালকারীর সংখ্যা নগণ্য হলেও ভেজাল খাদ্যপণ্য খাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। কতিপয়ের মূল্যবোধে ধস, নৈতিক অবক্ষয়, লোভের থাবা জনস্বাস্থ্যের জন্য যে সংকট সৃষ্টি করেছে এ থেকে নিষ্কৃতির লক্ষ্যে কঠোর ও লাগাতার আইনানুগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নিরাপদ খাদ্যের অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। খাদ্যনিরাপত্তার ধারণা সম্পর্কে ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছিল, ‘খাদ্যনিরাপত্তা সব মানুষের সারা জীবনের জন্য মৌলিক খাদ্য প্রাপ্তির ভৌত এবং অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তাকে বোঝায়।’ ১৯৯৬ সালে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনের সুপারিশে বলা হয়েছিল, ‘খাদ্যনিরাপত্তা এমন একটি বিষয়, যেখানে জনগণ সবসময় ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে, তাদের সুস্বাস্থ্য ও কর্মতৎপর জীবনের জন্য স্বাস্থ্য বিধিসম্মত প্রয়োজন মেটায়।’ কিন্তু আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতা এ থেকে কত দূরে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। বলার অবকাশ রাখে না, আমাদের সমাজে অনিরাপদ খাদ্যের পরিস্থিতি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। একদিকে অপুষ্টিকর মানহীন খাদ্য, অন্যদিকে ভেজাল দূষিত খাদ্য, এই দুইয়ের কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে বিপদের সৃষ্টি করেছে তা ‘টুটকা দাওয়াই’-এ সারবে না, এও স্পষ্ট।

আমরা এও জানি, বাংলাদেশে প্রস্তুত ওষুধ মানসম্মত ও বিশ্বে প্রশংসিত। কিন্তু দেশের বাজার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব! তা ছাড়া ভেজাল ওষুধ বেচাকেনা নির্মম বাস্তবতার চিত্র ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে কম উঠে আসেনি। ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নি গ্রাস করেছে ফলমূল-শাকসবজি-মাছ আরও কত কিছু। এই প্রেক্ষাপটে রজনীকান্ত সেনের জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক গানের এই লিরিক ‘কত কিছু খাই ভস্ম ও ছাই’ এ এক নির্মম ও কঠিন পরিচিত বাস্তবতা। মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যারা তুঘলকিকাণ্ড চালাচ্ছে, তারা জনশত্রু। তাদের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। ব্যবসায়ী নামের খাদ্যপণ্য সন্ত্রাসীদের রোগটা যেহেতু গুরুতর, সেহেতু এর প্রতিবিধানও হতে পারে সেই নিরিখেই। প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনের সংশোধন জরুরি। নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই। এটি শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, জাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। জনশত্রুদের চারণভূমি হতে পারে না রক্তস্নাত এ দেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত