১৯৭৩ সলের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করে মুক্তবুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এখন তা হামের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়েছে। সেই ৫২ থেকে ৬৯, একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অধ্যাপক ও ছাত্রছাত্রীদের ওপর পাক হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের জন্মের পেছনে তখনকার ছাত্র ও শিক্ষকদের অবদান। ৯০ দশকে স্বৈরাচার পতনের সময়, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা ছিল সামনের সারিতে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ছাত্ররাজনীতিকে ক্যাম্পাসে টিকিয়ে রেখে নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অতি উৎসাহী শিক্ষকরা, ছাত্রদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাদের ছাত্রজীবন কলুষিত করছে। শিক্ষকরাও অনেকটা ছাত্রদের মতো বিভিন্ন দলের বিভিন্ন রঙের খোলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রাজনৈতিক আনুগত্যের চর্চায় রত। এতে শিক্ষার পরিবেশ যেমন বিঘ্নিত হয় তেমনি শিক্ষকদের মর্যাদা হয় কলুষিত। কেননা, বর্তমানে রাজনীতি যখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব, অনৈতিক হিসাব-নিকাশ, অর্থের ছড়াছড়ি তখনই ছাত্র-শিক্ষক মুখোমুখি। আবার শিক্ষকরাও নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে, একজনকে ঘায়েল করতে তার ছাত্রর মাধ্যমে রাজনীতিতে পেশিশক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন।
প্রশ্ন আসে, তাহলে ছাত্র কেন নিজস্ব মতাদর্শের বাইরের শিক্ষককে মানবেন? সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে একজন শিক্ষিকা‘বিশ্ববিদ্যালয়ে তালিকার রাজনীতি চলতেই থাকবে’ শিরোনামে একটি কলামে লিখেছেন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল চিহ্নিত শিক্ষক দাবি তুলেছেন, শিক্ষকদের আরেকটি বড় গ্রুপকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’ তারা ২৩১ শিক্ষকের একটি তালিকা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে বলেছেন, ‘জুলাই চেতনাবিরোধী’ কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এরই সূত্র ধরে ঢাবি সিন্ডিকেট গঠন করেছে, নতুন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি। বিগত রাজনৈতিক সরকারের কাজের ধারাবাহিকতা যদি এখনো টিকে থাকে তাহলে ছাত্র-জনতা প্রাণ দিল কেন? কদিন আগে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের অধিবেশন হয়েছে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি ছাড়া। অভিযোগ ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তির বিক্ষোভের কারণে শিক্ষক প্রতিনিধিরা নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন। সিনেটে বর্তমানে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধির ২৪ জন ক্যাম্পাসে উপস্থিত থেকেও, কেউ প্রশাসনিক ভবনে যাননি। তাদের বেশিরভাগ আওয়ামী ও বামপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের (হলুদ দল) রাজনীতিতে যুক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন উনারা আগের আমলে শিক্ষক হয়ে রাজনীতি করেছেন? আর করলেও, কার জন্য? বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবলের ঘাটতি, সেশনজট কমানো, ক্যান্টিনের ছাত্রছাত্রীদের খাওয়ার মান বাড়ানোর জন্য বাড়তি বরাদ্দ, ছাত্রীদের হলের নিরাপত্তা নিশ্চিত, অক্সিজেনের সিলিন্ডার, অ্যাম্বুল্যান্সসহ উন্নত মেডিকেল সেন্টার স্থাপন, বিসিএস ডাক্তার নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থার কথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উচ্চ পর্যায়ে কতবার বলেছেন বা কতটা বাস্তবায়ন করিয়েছেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতি ও ছাত্রদের কল্যাণে কম গুরুত্ব দিয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে কোন মন্ত্রী, এমপিকে আনলে, নিজের আধিপত্য ধরে রাখা যায়, কোন প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষককে নাজেহাল করা যায় তাহলে কি সেই পূর্বসূরিদের ফর্মুলা ব্যবহার করা হচ্ছে? নিয়োগ পাওয়া ভিসি-প্রোক্টর- প্রভিসিরা কি নিয়মিত গবেষক? আন্তর্জাতিক কয়টা কনফারেন্স ও উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থিসিস মূল্যায়নের ইনভাইটেশন লেটার পেয়েছেন? কয়জন ছাত্রের পিএইচডির প্রিন্সিপাল সুপারভাইজার ছিলেন। এখন কতজন পিএইচডিতে এনরোল্ড আছেন? তবে ঢালাওভাবে সবাই এক না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি ও সেশনজট মুক্ত। তৎকালীন উপাচার্য ড. গোলাম রহমান শিক্ষার্থীদের দাবিকে মেনে নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথম রাজনীতিমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা দেন, যা এখনো বহাল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের নভেম্বর, শিক্ষকরাজনীতি রেখে ছাত্ররাজনীতির সংস্কার কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন রেখেছিলেন?
এ কথা ঠিক, কিছু পদলেহনকারী শিক্ষক যেভাবে ভিন্ন মতাদর্শী ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর বিগত সরকারের সময়ে অনৈতিক নির্যাতন চালিয়েছেন, তা অগ্রহণযোগ্য। পরিচিত একজন শিক্ষক, যিনি বিএনপি মতাদর্শে বিশ্বাসী, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার আক্ষেপ করে বলেছেন ‘গত ১৫ বছরে এক কাপ চায়ের দাওয়াতও পাইনি’। স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দানকারী দলের এগুলোর খুব দরকার ছিল? এক অধ্যাপক (প্রাক্তন ইউজিসি মেম্বার) বলছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। বিশেষ করে, শিক্ষকরাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রঙযুক্ত দলের নামের আড়ালে, সরাসরি রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করে শিক্ষকরা ছাত্রদের কল্যাণের চেয়ে নিজেদের আখের গোছানোর কাজ বেশি করেন। অন্যদিকে, ভিসি হওয়ার জন্য অধ্যাপকদের নগ্ন দৌড়ঝাঁপ শিক্ষক সমাজকে ভয়ংকর কলুষিত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে, ভিসি পুল থেকে ভিসি নিয়োগের একটা আইনি কাঠামো দাঁড় করানোর সুযোগ ছিল। যদিও তদবিরের মাধ্যমে তারাও উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন। অর্থাৎ শিক্ষক যখন থেকে লাল-নীলের আড়ালে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রেজিস্ট্রার, ফ্যাকাল্টি ডিন পদ পান তখন পদধারী শিক্ষকদের লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। কেননা পদধারী শিক্ষকরা আগেই যেহেতু কমিটমেন্ট দিয়ে পদ পেয়েছেন, তাই উনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে একপাক্ষিক রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে যা অন্য ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে তুলছে। যেহেতু দেশে সার্বিক চরিত্র বদলের আন্দোলন হয়েছে, তাই শিক্ষকদেরও সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। শিক্ষকদের দলীয় রঙের বিভাজনে শিক্ষার পরিবেশে, বহুমাত্রিক বিরূপ অভিঘাত লেগেছে। এর নিরসন জরুরি। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার দায় সংশ্লিষ্ট সবার। শিক্ষকদের দায় কিন্তু অনেকের চেয়ে বেশি এটি বিস্মৃত না হলেই মঙ্গল।
লেখক : গবেষক ও পরিচালক চট্টগ্রাম উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র
drrajibchakraborty.com