মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। পারস্পরিক বিশ্বাস ও আমানতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সভ্যতা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানবিক সম্পর্ক। কিন্তু যখন কেউ এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অন্যকে ঠকায়, প্রতারণার জাল বিছায়, তখন সে শুধু একজন মানুষকে কষ্ট দেয় না, সে মহান আল্লাহর বিধানকেও লঙ্ঘন করে। ইসলামে প্রতারণা কেবল নৈতিক অধঃপতন নয়, এটি একটি কঠিন গুনাহ, যার পরিণতি দুনিয়া ও আখেরাত দুই জায়গাতেই ভোগ করতে হয়।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বাসঘাতক ও পাপীদের পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সুরা নিসা ১০৭) এই আয়াতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, প্রতারক মানুষ মহান আল্লাহর হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে এটিই হয়তো সবচেয়ে বড় ক্ষতি, যখন মানুষ হেদায়াতের আলো হারিয়ে অন্ধকারে পথ হাঁটতে থাকে, তখন তার পতন অবধারিত।
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন বাজারে গেলেন এবং এক ব্যক্তির খাদ্যের স্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন ভেতরে ভেজা শস্য লুকানো আছে। তিনি সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? সে বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। তখন নবীজি (সা.) বললেন, তাহলে তুমি এটা ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পারত? যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসটি ইসলামে প্রতারণার প্রতি কঠোর অবস্থানের প্রমাণ। কেবল পণ্যে ভেজাল নয়, যেকোনো ধরনের ঠকানো, মিথ্যা তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়া বা কারো আস্থার অপব্যবহার করা, সবই এই সতর্কবার্তার আওতায় পড়ে।
প্রতারণার একটি বিশেষ দিক হলো মিথ্যা কসম বা শপথ করে পণ্য বিক্রি করা। বর্তমান সমাজে এটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে নবীজি (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘মিথ্যা কসম পণ্য বিক্রি করতে সাহায্য করে, কিন্তু এটি (বরকত) নষ্ট করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ প্রতারণা করে হয়তো সাময়িক লাভ আসে, কিন্তু সেই সম্পদে আল্লাহর বরকত থাকে না। বরকতহীন সম্পদ যত বেশিই হোক, তা মানুষকে শান্তি দেয় না।
দুনিয়াতেও প্রতারণার পরিণতি মারাত্মক। প্রতারক একবার ধরা পড়লে সমাজে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়। তার ব্যবসায় ধস নামে, সম্পর্ক ভেঙে পড়ে এবং মানুষ তার সঙ্গ এড়িয়ে চলে। এমনকি যদি সে আইনের হাতে ধরা নাও পড়ে, তবুও তার সম্পদের বরকত কমে যায়। পরিবারে অশান্তি, মানসিক অস্থিরতা এবং আত্মার অস্বস্তি তাকে দিন-রাত তাড়া করে। প্রতারকের মন কখনো প্রশান্ত থাকে না।
আখেরাতের বিষয়টি আরও ভয়াবহ। হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন প্রতারকের জন্য একটি পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং ঘোষণা করা হবে, এটি অমুক ব্যক্তির প্রতারণার নিদর্শন। (সহিহ মুসলিম) কেয়ামতের দিন যখন সমস্ত মানুষ একত্রিত হবে, তখন এই লজ্জা ও অপমান হবে অকল্পনীয়। দুনিয়ায় যে লুকিয়ে ঠকিয়েছিল, তাকে সেদিন সবার সামনে উন্মোচন করা হবে।
যারা প্রতারণার শিকার হন, তাদের হক আদায় না করলে কেয়ামতে সেই পাওনা পরিশোধ করতে হবে নেক আমল দিয়ে। নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? সাহাবিরা বললেন, যার দিরহাম নেই, সম্পদ নেই। নবীজি (সা.) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, জাকাত নিয়ে আসবে, কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, ফলে তার আমল এক এক করে পাওনাদারদের দিয়ে দেওয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম)
প্রতারণা কোনো চালাকি নয়। এটি আসলে নিজের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বড় অন্যায়। যে অন্যকে ঠকায়, সে প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার বরকত, মনের শান্তি এবং আখেরাতের সফলতা, তিনটিই নিজের হাতে বিসর্জন দেয়। তওবার দরজা এখনো খোলা আছে। যে ব্যক্তি প্রতারণা করেছে, সে যদি সত্যিকারের অনুশোচনা করে, ক্ষতিগ্রস্তদের হক ফিরিয়ে দেয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক