রঙে রূপে রাঙা বৈশাখ

বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাঙালিয়ানা সাজে রাঙাতে প্রস্তুত সবাই। বর্ষবরণের এই দিনে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, ফতুয়া, ওয়েস্টার্ন যা কিছুই হোক না কেন, সাজও হওয়া চাই পোশাকের সঙ্গে মানানসই। তা ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে সাজের সঙ্গে বৈশাখের সাজের অনেকটাই পার্থক্য রয়েছে। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু আবহাওয়া যেহেতু গরম, তাই সাজ হালকা হলে ভালো হয়। যেহেতু পহেলা বৈশাখের দিনে হালকা অথবা ভারী মেকআপ করা লাগবে, সেহেতু এর আগের রাতে ত্বক স্ক্রাবার করে নিন। এতে ত্বকের মরা কোষ দূর হবে। ত্বকের ধরন অনুযায়ী ফেস মাস্ক লাগাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ২০ মিনিট ত্বকে ফেস মাস্ক লাগিয়ে ২০ মিনিট পর মুখ ধুয়ে নিন। এরপর মুখ হালকা করে মুছে টোনার ও ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন। আগের রাতের ত্বক প্রস্তুত করার এই প্রস্তুতির পরদিন আপনার ত্বকে মেকআপ ভালোভাবে মিশে যেতে সাহায্য করবে।

সকালের ক্যানভাসে বৈশাখ

সকালে পোশাক হিসেবে প্রায় সবাই শাড়িকেই বেছে নেন। আর এ সময় বাইরে ঘোরাঘুরি বেশি হবে, তাই সাজ হালকা হলেই ভালো। এতে গরমে স্বস্তি পাবেন। প্রথমে ভালোভাবে ত্বককে পরিষ্কার করে নিন। এবার আপনার ত্বক যদি শুষ্ক হয়ে থাকে, তাহলে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে তারপর তৈলাক্ত ত্বক হলে হাইড্রেটিং ক্রিম লাগাতে হবে। এবার প্রাইমার লাগিয়ে নিন, যা আপনার মেকআপের স্থায়িত্ব ধরে রাখবে। এবার মুখে হালকা লিকুইড ফাউন্ডেশন লাগান। যদি ফাউন্ডেশন লাগাতে না চান, তাহলে বিবি অথবা সিসি ক্রিম লাগিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ফাউন্ডেশন যেন তেল ও পানিনিরোধক হয়, সেদিকে লক্ষ রাখবেন। যেহেতু সকালে রোদ বেশি থাকবে, তাই চোখে হালকা সাজ দেওয়াই ভালো। পোশাকের রঙ মিলিয়ে হালকা আইশ্যাডো ব্লেন্ড করে নিন। এরপর চোখের নিচে গাঢ় করে কাজল এঁকে নিন। নিচে কাজল দিলে ওপরে লাইনার না দেওয়াই ভালো। এরপর ফেস কন্টুরিং করে নিন। যেহেতু হালকা সাজ, তাই গাঢ় রঙের যেকোনো বোল্ড কালারের লিপস্টিক লাগিয়ে নিন। তবে প্রথমে লিপ লাইনার দিয়ে শেইপ ঠিক করুন। সকালের সাজে হাইলাইটার না দেওয়াই ভালো।

লালের গানে সাদার ছোঁয়া

বিকেলের সাজ ভারী হতেই পারে। যদি সেভাবে গরম না থাকে।  প্রথমে ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করে তৈলাক্ত ত্বক হলে হাইড্রেটিং ক্রিম আর শুষ্ক ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন। এরপর কনসিলার লাগিয়ে মুখের ব্রণ ও দাগ ঢেকে দিন। ত্বকের ধরন অনুযায়ী লিকুইড ফাউন্ডেশন বা বিবি ক্রিম লাগিয়ে বেইস মেকআপ করুন। এবার কন্টুরিংয়ের সাহায্য ফেস কন্টুর করে নিন।

চোখের সাজে ন্যুড কালার প্রাধান্য পাবে। পোশাকের রঙের সঙ্গে মানিয়ে ন্যুড কালার আইশ্যাডো বেছে নিন। এরপর ভালোভাবে চোখের আইশ্যাডো ব্লেন্ড করে নিন, যাতে মেকআপের সঙ্গে মিশে যায়। ন্যুড কালার আইশ্যাডো লাগালে কাজল অথবা লাইনার যেকোনো একটি লাগাতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, যেন গাঢ় বা মোটা না হয়। এবার চোখের পাপড়ি গোড়া থেকে কার্ল করে নিয়ে মাশকারা লাগিয়ে নিন। এ ক্ষেত্রে চোখ অনেকটা খোলা মনে হবে। এরপর টি-জোন (কপাল, গাল ও চিবুকে) শিমার দিয়ে হাইলাইট করে নিতে পারেন। চিক বনে হালকা ব্লাশন ব্যবহার করে নিন। ব্লাশনের ক্ষেত্রে পিচ-কালার হলে ভালো হয়। চোখের সাজ যেহেতু ন্যুড কালার, সে ক্ষেত্রে পোশাকের রঙের সামঞ্জস্য রেখে গাঢ় রঙের লিপস্টিক লাগিয়ে নিন।

আলপনায় আঁকা রাতের সাজ

রাতে উৎসবে বিভিন্ন গেটটুগেদার পার্টিসহ নানা প্রোগ্রাম থাকে, তাই সন্ধ্যা বা রাতে ভারী মেকআপ করতে পারেন । ভারী মেকআপের ক্ষেত্রে বেসে ফাউন্ডেশন লাগিয়ে নিন। আপনার ফেস টোনের ধরন হিসেবে প্যানকেকও লাগাতে পারেন। ত্বকে মেকআপ ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিন। রাতে চোখের সাজে স্মোকি আই করতে পারেন। একটি গাঢ় রঙ আর সঙ্গে আরেকটি উজ্জ্বল রঙের আইশ্যাডো দিয়ে স্মোকি আই করলে ভালো লাগবে। এরপর চোখের নিচে হালকা কাজল লাগিয়ে ওপরে আইলাইনার লাগিয়ে নিন। লাইনার একটু টেনে নিতে পারেন। রাতে হাইলাইটার হিসেবে শিমার ব্যবহার করতে পারেন। এরপর ফেস কন্টুর করে নিন। এ ক্ষেত্রে বাদামি রঙ ব্যবহার করুন। কেননা, এখনকার সাজের ট্রেন্ড হলো ত্বকে একটু বাদামি উজ্জ্বলতা আনা। এবার চোখে যেহেতু জমকালো সাজ দিয়েছেন, তাই ঠোঁটে ন্যুড যেকোনো কালার লিপস্টিক লাগিয়ে নিন। হালকা গোলাপি শেডের ব্লাশন দিতে পারেন।

গয়নায় চাই বাঙালিয়ানা

বৈশাখে পোশাক আর সাজের সঙ্গে আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো গয়না। গয়না পোশাক ও সাজে আকর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। বৈশাখ উপলক্ষে টিএসসি প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে দোয়েল চত্বর, নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট, গাউছিয়া, ইডেন কলেজসহ প্রায় সব জায়গায় দেখা যায় গয়নার সমাহার। চুড়ি, দুল, মালা নানা রঙের ও ঢঙের গয়না কিনতে পারবেন। বৈশাখের গয়না হিসেবে জুয়েলারি শপগুলোতে মাটি, মেটাল, কড়ি ও বিডসের নানা ধরনের গয়না পাওয়া যাচ্ছে। গয়নায় বৈচিত্র্য খুঁজতে অনলাইনপেজগুলো দেখতে পারেন।

পোশাকের ধরন হিসেবে আপনার পছন্দসই গয়না পাবেন এখানে। এ দিন হাতে রেশমি চুড়ি বেশি চললেও এর পাশাপাশি মাটির বালা, কাচের চুড়ি, মেটালের নানা নকশার বা পাথর বসানো চুড়ি পরতে পারেন। চুড়ি না পরে ছোট-বড় নানা কাটিং ও নকশার আংটি পরেও হাত সাজাতে পারেন। সমসাময়িক ট্রেন্ডে বিডস ও মেটালের গয়না বেশ চলছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফলের বিচির গয়না, প্লাস্টিক, কাচের পুঁতি আর কাঠের পুঁতির গয়নার বাহারও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এবার বৈশাখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জুয়েলারি শপে পুঁতি ও মেটালের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে হালকা ও ভারী নকশার বৈশাখী গয়না। বৈশাখের পোশাক ও সাজ মানিয়ে যাবে এসব গয়না। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ঝুনঝুনি, চুমকি, পুঁতি ব্যবহার করে মাটির গয়না তৈরি করা হয়েছে বৈশাখকে কেন্দ্র করে। আবার অনেকেই এই দিনে ফুলের গয়না পরতে আগ্রহী। ফুলেল সাজে নিজেকে অনন্য করে তুলতে পরতে পারেন পোশাকের সঙ্গে মানানসই রঙবেরঙের ফুলের গয়না। সবাই মেটালের গয়নার প্রতি ঝুঁকছেন। গলায় কিছু না পরে কানে ভারী কানের দুল পরতে পারেন, এই ট্রেন্ড এখন বেশ চলছে। এ ছাড়া কানে ছোট টপ বা দুল পরতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এক কিংবা দুই লহরের লম্বা মালা পরতে পারেন। আজকাল অনেকেই চোকারের গয়নাও বেছে নিচ্ছেন। যা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, ওয়েস্টার্ন সব পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যাবে।

চুলও সাজুক বহু রূপে

শাড়ির সঙ্গে : বৈশাখী শাড়ির সঙ্গে বেণি সব থেকে বেশি মানানসই। আপনি শাড়ির সঙ্গে অনেক বেণি করতে পারেন। ফিস টেইল হতে পারে। এ ছাড়া মধ্যখানে সিঁথি করে লম্বা করে খেজুর কাঁটা বেণিও করে নিতে পারেন। এ ছাড়া বেণির সঙ্গে নানা ধরনের কালারফুল রিবন পরতে পারেন, যা আপনার বৈশাখের সাজকে নতুনমাত্রা দেবে। এ ছাড়া ফুল পরতে পারেন বিভিন্ন ধরনের। শোলার, আর্টিফিশিয়াল কিছু ফুল রয়েছে তাও পরতে পারেন। এ ছাড়া আপনি চাইলে কাগজের ফুলও পরা যায়। আবার বেণি না করে নানা ধরনের ট্রেডিশনাল খোঁপাও করতে পারেন। সাইড বান করে চুলে তাজা ফুল লাগাতে পারেন, যা আপনার মধ্যে ট্রেডিশনাল লুক আনবে।

সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি ও ফতুয়া : এ ধরনের পোশাকের সঙ্গে চুল খোলা রাখতে পারেন। সঙ্গে চুল আয়রন করে নিতে পারেন। এ ছাড়া নিচে হালকা কার্লও করা যায়। গরমের সময় আপনি চুল হাফ বেঁধে নিতে পারেন। এ ছাড়া ফ্রেঞ্চ বেণিও করা যায়।  চুলে লুজ ও ওয়েভি কার্লও করতে পারেন।

টপ জিনস : ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গে ট্রেডিশনাল লুক আনতে নানা ধরনের ট্রেডিশনাল বান করে নিতে পারেন। এ ছাড়া চুলকে সামনে পাফ করে সব চুল গুছিয়ে পনিটেইল করতে পারেন। ভলিউম করে কার্লও করা যায়।

মডেল : প্রিয়মনি পোশাক : রঙ বাংলাদেশ

সাজ :  শোভন মেকওভার

ছবি : আবুল কালাম আজাদ