জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ‘অপরাধ-নগর’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পাশের ইসলামনগরে একের পর এক নারী নির্যাতন, হত্যা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া কাঠামোগত হত্যাকা- (আত্মহত্যা) ও মাদকাসক্ত করার মতো অপরাধমূলক কর্মকা-ের জন্য বারবার আলোচনায় আসছে এলাকাটি।

সম্প্রতি ১৮ দিনের ব্যবধানে এলাকাটিতে একটি নারী নির্যাতন ও এক নারী শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসসংলগ্ন ওই এলাকায় প্রশাসনের যথাযথ তদারকি এবং বাড়ির মালিকদের উদাসীনতার কারণে ভাড়া বাসায় এসব অপরাধ বাড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘ক্যাম্পাসের পাশের এলাকাগুলোতে বিশেষ করে ইসলামনগরে ঘটে যাওয়া খুন, ধর্ষণ বা অপঘাতে মৃত্যুর মতো ঘটনা দেখে আমার অবাক লাগে না। কেননা অপরাধ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসন যখন উদাসীন থাকে, ভিকটিমের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না, ভিকটিমকে ন্যায়বিচার দিতে অপারগ থাকে, তখন ক্রিমিনালদের সাহস বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। বছরের পর বছর ধরে ইসলামনগরে একের পর এক ভয়ানক হত্যাকা-, ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতন-নিপীড়নের মতো কর্মকান্ড ঘটলেও আমরা কখনো দেখিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এর সুষ্ঠু বিচার হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের গেল দুই মাসে একটি হত্যাকা-, একটি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন এবং মাদককে কেন্দ্র করে একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে এলাকাটিতে। সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ৫১তম ব্যাচের ছাত্রী শারমিন জাহানকে ইসলামনগরের একটি ভাড়া বাসায় রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় শারমিন জাহানের স্বামী ফাহিম আল হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম ব্যাচের এক ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেল করে ইসলামনগরের ভাড়া বাসায় ডেকে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীকে হাতুড়িপেটা, বিড়ির আগুনের ছ্যাঁক দেওয়াসহ অমানুষিক নির্যাতনের পর ধর্ষণেরও উল্লেখ করে ভুক্তভোগী ছাত্রী বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। এখনো গ্রেপ্তার হয়নি অভিযুক্ত তারিকুল।

গত ২৮ জানুয়ারি ইসলামনগরে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে একই পরিবারের দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। পরে সেই দ্বন্দ্ব মেটাতে গেলে দুই ভাইয়ের এক ভাই বাসায় গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলে গুরুতর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তার নাম সাইফুল ইসলাম রনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।

২০২৩ সালের ১৫ মে ইসলামনগরের একটি ভাড়া বাসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম ব্যাচের এক ছাত্রীকে মাদক সেবনের পর ধর্ষণ করার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে বহিরাগত মো. রাকিব হোসেন ও মেজবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দিয়ে শিক্ষার্থীরা ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাটি জানালে পুলিশ এসে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে।

এ ছাড়া ইসলামনগরে ভাড়া বাসায় গেল কয়েক বছরে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে একটি ভাড়া বাসায় ছেলে বন্ধুকে ভিডিও কলে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন ইতিহাস বিভাগের এক ছাত্রী। এসব ঘটনায় ক্যাম্পাসে আন্দোলনের সৃষ্টি হলেও প্রশাসনের দিক থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ইসলামনগর অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত খুন, ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন “ক্যাম্পাসের বাইরে”র দোহায় দিয়ে দায় এড়িয়ে যায়। অপরাধের প্রায় অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে মাদক সিন্ডিকেট জড়িত।’

এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুবেল হাওলাদার বলেন, ‘এলাকাটিতে আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। এমপি মহোদয়ও এলাকাটিতে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি আমরা সামাজিকভাবেও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছি। সবার আন্তরিকতায় এলাকাটিতে সমস্যা কমিয়ে আনতে পারব বলে আশা করছি।’

ভাড়া বাসায় তদারকি নেই : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য শৃঙ্খলা অধ্যাদেশের (২০১৮) হলসংক্রান্ত বিধির (ফ) অনুযায়ী, প্রতি শিক্ষার্থীকে সেশনের শুরুতে প্রথম দিনেই হলে প্রত্যাবর্তন করতে হবে এবং তারা প্রভোস্টের অনুমতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকাকালে হলে অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। হলগুলোতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে নির্ধারিত আসন রয়েছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) মেয়াদোত্তীর্ণ নেতাকর্মীদের কারণে কৃত্রিম আসন সংকট থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের পর সে সংকট দূর হয়েছে। তারপরও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পাশের ইসলামনগর, আমবাগান ও গেরুয়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। বাড়ির মালিকরা বাসা ভাড়া দেওয়ার আগে ও পরে তেমন কোনো তদারকি করেন না। ফলে দেখা যায়, এসব বাসায় মাদক সেবন, বিবাহবহির্ভূত ছেলেমেয়ে একসঙ্গে থাকা এবং ব্ল্যাকমেল করে নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটায়।

ইসলামনগরের একটি বাড়ির মালিক মোস্তফা হাসান (কল্লোল) বলেন, ‘আমার বাড়িতে কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে, সেসব ফ্ল্যাটে যারা ভাড়া থাকেন তাদের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। তবে অধিকাংশ বাসার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাসার মালিকরা তাদের বাসায় কারা উঠছে, কী করছে সেসব সম্পর্কে কোনো তথ্য রাখেন না। বাসা ভাড়া হলেই তারা খুশি। ফলে এসব বাসায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, নারী নির্যাতন ও মাদকাকা-ের মতো ঘটনা বাড়ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, ‘ইসলামনগরে যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে আমরা খুব উদ্বিগ্ন। যেসব শিক্ষার্থী হলে থাকবেন না, বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবেন, তাদের হল প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। হল প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তারপর বাসা মালিকরা বাসা ভাড়া দেবেন। কোন শিক্ষার্থী হলে থাকছেন না বা কোন বাসায় ভাড়া থাকছেন, সে সংক্রান্ত তথ্য প্রশাসনের  জানা থাকতে হবে। তাহলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি এসব এলাকায় মাদকের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আমরা নজরদারি করার জন্য অনুরোধ জানাব।’