‘কাট্টোল পাযোগ বিঝু এজোক’ অর্থাৎ কাঁঠাল পাকবে, বিঝু বা চৈত্রসংক্রান্তি আসবে। বউ কথা কও পাখি বা কোকিল যখন কুহু কুহু ডাকবে, তখনই বিঝু বা চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবের আগমনী বার্তা আসে। চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন। মঙ্গলবার থেকে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ। পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে ‘বৈসাবি’ উৎসব হিসেবে পালন করে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে। পাহাড়ের তিন সম্প্রদায় সেই দিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। সব মানুষের মাঝে প্রতি বছর এক আনন্দের বন্যা আসে, যা জাতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে, একে অপরের স্নেহ ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে। বিজ্ঞজনরা বলেন, ‘বৈসাবি’ অহিংসার প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, মৈত্রীর প্রতীক। বৈ+সা+বি=বৈসাবি, অর্থাৎ ‘বৈ’ মানে ‘বৈষু’ এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা। ‘সা’ মানে ‘সাংগ্রাই’ এটি মার্মা সম্প্রদায়ের ভাষা। ‘বি’ মানে ‘বিঝু’ এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা। বছরের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’, মার্মা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’, চাকমা সম্প্রদায় ‘বিষু’ নামে অভিহিত করে। তিন সম্প্রদায়ের আদি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’। কিন্তু কোন সম্প্রদায় কীভাবে বৈসাবি উদযাপন করে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী, ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে ‘বৈষু’ বলে। এরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ওই দিনে তারা অনাগত দিনগুলোতে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্য মন্দিরে গিয়ে পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করে। কিশোর-কিশোরীরা প্রতি বাড়িতে গিয়ে ফুল বিতরণ এবং যুবক-যুবতীরা তার প্রিয়জনকেও ফুল দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানায়। ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’ তিনটি পর্বে উদযাপন করে। হারি বৈষু, বিষুমা বৈষু ও বিসিকাতাল বৈষু। এ উৎসবে তারা জাতি ভেদাভেদ, হিংসাবিদ্বেষ, শত্রুতা সবকিছু ভুলে গিয়ে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বৈষু দিনে এরা পাচন, সেমাই, পিঠা ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করে থাকে। গরু-মহিষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলে তাদের দ্বারা বছরের অন্ন সংস্থান হয় বলে এ দিনে গরু-মহিষকে স্নান করিয়ে, গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। ধূপ, প্রদীপ জে¦লে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মধ্য দিয়ে তারা বৈষু পালন করে। ‘সাংগ্রাই’ একটি মার্মা ভাষা। মার্মা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করে থাকে। বৈশাখের প্রথম দিন তারা সাংগ্রাই উৎসব পালন করে। পিঠা, পাচন, সেমাইয়ের আয়োজন থাকে। সব বয়সী লোকেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায় ও আনন্দ উৎসব করে।
দিনের প্রধান আকর্ষণ জলোৎসব। মার্মা ভাষায় এটিকে বলে ‘রিলংপোয়ে’। জলখেলার জন্য আগে থেকে তারা প্যান্ডেল তৈরি করে। এখানে যুবক-যুবতীরা একে অপরকে লক্ষ্য করে, জলছিটিয়ে কাবু করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। বয়োবৃদ্ধরা এ দিনে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে, বিহারে বা মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অতর্কিত জল ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে সাংগ্রাই উৎসবকে বিদায় জানায়। বিঝু, এটি চাকমা ভাষা। চাকমারা বিঝু উৎসবকে তিন পর্বে ভাগ করে উপভোগ করেন। বছরের শেষ অর্থাৎ চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুল বিঝু, ৩০ চৈত্রকে মূল বিঝু ও নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ ‘গজ্যাপজ্যা’ বিঝু হিসেবে উৎসব পালন করে। ফুল বিঝুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নানা রকমের ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা। ফুল সংগ্রহ করার পর চারভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে নিজের মনের মতো করে বাড়ি সাজায়, অন্য একভাগ দিয়ে বৌদ্ধবিহারে গিয়ে সমবেতভাবে বুদ্ধের উপাসনা করে এবং ভিক্ষুদের নিকট থেকে পঞ্চশীল গ্রহণপূর্বক ধর্মদেশনা শোনেন। অপর একভাগ দিয়ে ছড়া বা নদীতে বা পুকুরপাড়ে পূজামণ্ডপ তৈরি করে প্রার্থনা করে যেন সারা বছর পানির ন্যায় অর্থাৎ পানি যেমন শান্তশিষ্ট সেরূপ নিজেও শান্তশিষ্ট বা ভালোভাবে জীবনযাপন অতিবাহিত করতে পারে। আর একভাগ ফুল নিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার উপহার দেয়। কেউ কেউ ফুল দিয়ে বন্ধুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়।
মূল বিঝু হচ্ছে বিঝুর প্রথম দিন। ফুল বিঝু দিনে মূল বিঝুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এ দিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে। তারা ৩০-৪০ প্রকার তরিতরকারি মিশ্রণে গণ্ট বা পাচন তৈরি করা হয়। প্রচলিত আছে এ দিন যে যত বাড়িতে গিয়ে যত বেশি পাচন খাবে তত বেশি মঙ্গল হবে। পাচন ছাড়াও নানা ধরনের পিঠা, বিনিধানের খই, লাড়ু, সেমাই, মদ ইত্যাদির আয়োজন করে। এ দিনে সবার বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যখন যার ইচ্ছে আসতে কোনো বাঁধা নেই। যারা বেড়াতে আসে তাদের বাড়ির মালিক যথাযথ আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখে না। উপরে উল্লিখিত আইটেম পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাড়ির দরজা, উঠানে, গো-শালায়, বৌদ্ধবিহারে প্রদীপ জ¦ালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়। নববর্ষের প্রথম দিনটিকে চাকমারা গজ্যাপজ্যা বিঝু হিসেবে উদযাপন করে। এই দিন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের সঙ্গে দিনটিকে অতিবাহিত করা হয়। ছোটরা বড়দের নমস্কার করে এবং স্নান করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। সন্ধ্যায় স্থানীয় বৌদ্ধবিহারে গিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে অনাগত দিনগুলো যাতে সবার জন্য মঙ্গলময় হয় এই প্রার্থনা শেষের পর গজ্যাপজ্যা বিঝুর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়। ‘বৈসাবি’ হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের উৎসব। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে অতীতের সব দুঃখ, গ্লানি, বেদনা, ক্ষোভ, উঁচু-নিচু, ধনী-গরিব বৈষম্য পরিহার করে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান, অন্যদিকে সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশও ‘বৈসাবি’ বহন করে। এটি উপজাতীয়দের উৎসব হলেও সবার অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সফলতা লাভ করে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, এই উৎসব এখনো সর্বজনীনতা পায়নি। হাজার হাজার পাহাড়িরা এই উৎসবে এক অপরকে আপন করে নেয়। যদিও দেশের সব ধরনের মানুষের মধ্যে এই উৎসব নিয়ে নানা ধরনের আকর্ষণ রয়েছে। অনেক জেলার মানুষ এই উৎসব উপলক্ষে পার্বত্য এলাকায় বেড়াতে আসেন। সবাইকে আপন করে নিয়ে ভিন্ন এক আমেজ সৃষ্টি হয় উৎসবে। তখন আমাদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভেদ চোখে পড়ে না। সে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। সব মানুষ সুখী হোক।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক
shatadal.barua@yahoo.com