ইতিহাস কখনো কখনো এমন মুহূর্তে এসে দাঁড়ায়, যখন শক্তির অহংকার হোঁচট খায়। এপ্রিলের শুরুতে মধ্যরাতের কাছাকাছি সময়ে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তার ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা করলেন ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব ‘কার্যকর আলোচনার ভিত্তি’, তখন বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হলো। পঁয়তাল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে দেশটিকে ‘দুষ্টের আখড়া’ বলে চিহ্নিত করেছে পশ্চিমা বিশ্ব, যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে মাত্র ৪০ দিন আগে শহীদ করেছে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমানবাহিনী, সেই ইরান আজ উঠে দাঁড়িয়েছে নিজ শর্ত ও মর্যাদায়। তেহরানের রাস্তায় যে আনন্দের ঢল নামছে, তা শুধু যুদ্ধবিরতির উৎসব নয় বরং এটি অসম লড়াইয়ে টিকে থাকার এবং মাথা না নোয়ানোর উদযাপন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ কেঁপে ওঠে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের তাণ্ডবে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই অভিযানে, মাত্র ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি আঘাত হানা হয় ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন নিজের আবাসিক কম্পাউন্ডে, তার পরিবারের সদস্যরাও প্রাণ হারান। ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ২০০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান নিয়ে পশ্চিম ও মধ্য ইরানে ৫০০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে যা ছিল ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অভিযান। কিন্তু এর পটভূমি তৈরি হয়েছিল অনেক আগে। ২০২৩ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েল একে একে ইরানের প্রক্সি শক্তিকে দুর্বল করেছে। ২০২৫ সালের জুনে, মাত্র বারো দিনের যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছিল। ২০২৬-এর শুরুতে ইরানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ হয়েছে। যেখানে অনেকে নিহত হয়েছেন।
হোয়াইট হাউজের ধারণা ছিল, ইরান ভেঙে পড়বে। তবে যুদ্ধের প্রথম রাতেই তারা কয়েকশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন নিক্ষেপ করে ইসরায়েল, মধ্যপ্রচ্যে মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে। বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব থেকে শুরু করে, সাইপ্রাসের ব্রিটিশ ঘাঁটি পর্যন্ত ইরানের আঘাত পৌঁছে যায়। এই পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, ইরান শুধু প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করছে না বরং পাল্টা কৌশলে মাঠে নেমেছে। ইরানের সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র কিন্তু কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক বোমা নয়, সেটি হলো হরমুজ প্রণালি। পৃথিবীর মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যার মধ্য দিয়ে যায়। ইরান যখন এটি বন্ধ করে দিল, তখন বিশ্বঅর্থনীতি যেন হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া একজন মানুষের মতো কাঁপতে শুরু করল। গত ৪ মার্চ থেকে হরমুজ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পর ব্রেন্ট ক্রুড তেলের মূল্য, সর্বোচ্চ ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার প্রধান এই সংকটকে বললেন ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।’ বিশে^র বিভিন্ন দেশে খাদ্য সরবরাহ ভেঙে পড়ে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি খাদ্য আমদানি এই পথ দিয়ে হয়। এশিয়ার দেশগুলো বিশেষত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীন জ্বালানি সংকটে পড়ল। ফিলিপাইন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করল। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিল। এই সংকট স্পষ্ট করে, আধুনিক বিশ্বে সামরিক শক্তিই চূড়ান্ত কথা বলে না। ইউরোপ, চীন, জাপান সবাই কূটনৈতিক সমাধানের দাবি তুলল।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ভেবেছিল, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও সামরিক আঘাতের চাপে ইরানি শাসনব্যবস্থা ধসে পড়বে। কিন্তু যে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল, বাইরের আক্রমণের মুখে তারাই সেই সরকারের পাশে দাঁড়াল। এটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক চিরন্তন সত্য। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি প্রথম বিবৃতিতেই, হরমুজ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিলেন এবং অঙ্গীকার করলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ মানচিত্র আর আগের মতো থাকবে না। চীন ইরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। ফলে চীনা জাহাজগুলো হরমুজ দিয়ে চলাচলের বিশেষ অনুমতি পেয়েছে। ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, চীন ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সাহায্য করেছে। রাশিয়া ও চীনের এই অবস্থান, আমেরিকার একক কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নেতানিয়াহু যুদ্ধে ঢুকেছিলেন বড় স্বপ্ন নিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন, পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ বিনাশ, লেবাননে হিজবুল্লাহর অবসান। কিন্তু কিছুই হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ইসরায়েলের বিরোধী দলনেতা, ইয়্যার লাপিড বলেছেন এটি ‘ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ কূটনৈতিক বিপর্যয়’। বামপন্থি দলনেতা ইয়্যার গোলান অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু একটি লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু ইরান যুদ্ধ থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। নেতানিয়াহু, ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছিলেন যেন ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের ছাড় বাদে কোনো চুক্তি না হয়। কিন্তু ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত নিজের উপদেষ্টাদের কথা শুনলেন। ইসরায়েল এখনো লেবাননে হামলা চালাচ্ছে যুদ্ধবিরতি অস্বীকার করে। কিন্তু এটা তাদের একাকিত্ব এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাকে সামনে এনেছে। ইসরায়েলের পাঁচ দশকের কৌশলগত অহংকারের এই পরিণতি, ইতিহাস ভুলবে না। গত ৭ এপ্রিল ছিল অস্থিরতায় ভরপুর। সকালে ট্রাম্প যখন ট্রুথ সোশ্যালে লিখলেন রাত ৮টার মধ্যে ইরান হরমুজ না খুললে ‘একটি সভ্যতা আজ রাতে মরে যাবে, আর কখনো ফিরে আসবে না।’ বিশ্ববাজার থরথর করে কাঁপছিল। তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছিল, ইরানের বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের সামনে মানুষের মানবঢাল তৈরি হলো। তারপর সন্ধ্যায় হলো পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং হামলা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানালেন। মাত্র দেড় ঘণ্টা বাকি থাকতে, ট্রাম্প ঘোষণা করলেন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সমঝোতা নিশ্চিত করলেন। ইরান বলল ‘যুদ্ধের প্রায় সব লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।’ দুই পক্ষই বিজয় দাবি করল। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, কার কথার ওজন বেশি। ঐতিহাসিক ১০ দফায় যুদ্ধবিরতি হলো। ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকেও ছাড়িয়ে যাওয়া একটি দলিল। এই ১০ দফার প্রথম শর্ত হলো আমেরিকার কাছ থেকে ভবিষ্যতে আর কখনো সামরিক হামলা না করার লিখিত প্রতিশ্রুতি।
গত ৪৮ বছর ধরে যে দেশটিকে সামরিক হুমকির মুখে রেখেছে আমেরিকা, সেই দেশই এখন লিখিত অ-আগ্রাসন গ্যারান্টি চাচ্ছে। যা পশ্চিমা সামরিক আধিপত্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এবার হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ রেখে, প্রতি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। যে অর্থ দিয়ে ইরান যুদ্ধকালের ক্ষতি পোষাবে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে, ইরানের কর্তৃত্ব এখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হওয়ার পথে। দ্বিতীয় দফা তেমন জটিল কিছু নয়। তৃতীয় দফায় রয়েছে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকারের দাবি, যা নিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে। চতুর্থ দফায় হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিসহ ইরানের সমস্ত আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, যা ইসরায়েলের জন্য হজম করা কঠিন। পঞ্চম দফায় ইরানের বিরুদ্ধে সমস্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ ও শর্তহীনভাবে প্রত্যাহারের দাবি, যা ২০১৫ সালের আংশিক ও শর্তসাপেক্ষ প্রত্যাহারের চেয়ে অনেক বেশি। ষষ্ঠ ও সপ্তম দফায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আইএইএর ইরানবিরোধী সব প্রস্তাব বাতিলের দাবি, যা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক কাঠামোয় ইরানের মর্যাদার পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করবে। অষ্টম দফায় বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধ-সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি, যা বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থাপত্যে আমূল পরিবর্তন আসবে। নবম দফায় বিদেশে জমাটবদ্ধ ইরানি সম্পদ মুক্তি ও যুদ্ধকালের ক্ষতিপূরণের দাবি। আর দশম ও সবচেয়ে পরিপক্ব দফায় রয়েছে সব চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত করার দাবি। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ট্রাম্প একাই ছিঁড়ে ফেলেছিলেন, এবার ইরান চাচ্ছে এমন একটি কাঠামো যা যে কোনো ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তে অকার্যকর হয়ে না যায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, অপারেশন এপিক ফিউরি ছিল ‘ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়’। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, আমেরিকার আক্রমণাত্মক নীতি ‘চূর্ণবিচূর্ণ পরাজয়’ পেয়েছে। দুটি বর্ণনাই আংশিকভাবে সত্য, কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়। সত্য হলো আমেরিকা সামরিকভাবে ইরানকে বিপর্যস্ত করেছে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। ইরানের শাসনকাঠামো অবিচল রয়েছে, নতুন নেতা এসেছেন। সর্বোপরি ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে ‘কার্যকর’ বলেছেন। এটাই ইরানের সবচেয়ে বড় বিজয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ট্রিটা পারসি বলেছেন, ট্রাম্পের সামরিক শক্তির ব্যর্থ প্রয়োগ আমেরিকার সামরিক হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দিয়েছে। যে আমেরিকা কোনো দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেয় এবং তারপর সেই দেশের শর্তেই আলোচনায় বসে সেই আমেরিকার হুমকির শক্তি কতটুকু থাকে, সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হচ্ছে। এই যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধবিরতি একটি নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। বিশ্বের একক পরাশক্তির যুগ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান নতুন মেরূকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। আমেরিকার মিত্রদের মধ্যেই বিভাজন দেখা দিচ্ছে। ইউরোপ কূটনীতির পথ চেয়েছে, জাপান-ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া সবাই শান্তির পক্ষে কথা বলেছে। একক সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার যুগ শেষ হয়ে আসছে। এটাই হয়তো যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ফলাফল। তেহরানের রাস্তায় আজ যে মিছিল হচ্ছে সেটা শুধু একটি জাতির বিজয় উৎসব নয়। এটা প্রতিটি সেই মানুষের কথা, যে বিশ্বাস করে শক্তি দিয়ে সব কিছু পাওয়া যায় না। এটা সেই চিরকালীন সত্যের প্রমাণ যে, দৃঢ়তার সামনে আধিপত্যের সীমা আছে। ইরান তার সর্বোচ্চ নেতাকে হারিয়েছে, হাজারো মানুষ হারিয়েছে, অবকাঠামো হারিয়েছে। কিন্তু আত্মসম্মান হারায়নি। ইতিহাসে সেটাই সবচেয়ে মূল্যবান বিজয়।
লেখক: কলামিস্ট, গবেষক ও শিক্ষক
sultanmh17@gmail.com