সংকটে মুমিনের পাঁচ করণীয়

জীবনে চলার পথ সব সময় মসৃণ হয় না। কখনো আমরা হাঁটি নরম ঘাসের ওপর দিয়ে, আবার কখনো আমাদের পায়ের নিচে থাকে তপ্ত বালুকা অথবা ধারালো পাথর। মহান আল্লাহ এই পৃথিবীর কাঠামোটিই এমনভাবে তৈরি করেছেন যেখানে স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই। দিন শেষে রাত আসে, আবার রাতের অন্ধকার চিরে ভোরের আলো ফুটে ওঠে। মানুষের জীবনও এই আলো-আঁধারের সমন্বয়ে চলে। আনন্দ আর বেদনা এখানে হাত ধরাধরি করে চলে। এই যে সময়ের বিবর্তন, কখনো সুখের প্লাবন আবার কখনো দুঃখের মরুভূমি, একে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ মানুষের নেই। বরং এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রকৃত পরিচয় এবং স্রষ্টার প্রতি তার নিগূঢ় সম্পর্কের গভীরতা। তাই দুঃসময় জীবনের কোনো আকস্মিক ছন্দপতন নয়, বরং এটি আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের এক বিশেষ মুহূর্ত। এখানে এমন পাঁচটি উপায় উল্লেখ করা হলো, যেগুলো অবলম্বন করলে সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব এবং তা উভয় জগতের পাথেয় হবে।

ধৈর্য ধারণ করা : মানুষের জীবনে পরীক্ষা আসে বিভিন্ন রূপে। কখনো প্রিয়জন হারানোর শোক, কখনো আর্থিক অনটন, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে, হতাশ হয়ে ভেঙে পড়া অথবা ধৈর্যধারণ করা। ইসলামের দৃষ্টিতে ধৈর্যধারণ করা ইবাদত। যখন কোনো বিপদ অতর্কিতভাবে হানা দেয়, তখন মানুষের মন দিশেহারা হয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত ধৈর্য।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩) এই আয়াতের অর্থ অনেক গভীর। মহান আল্লাহ কেবল ধৈর্য ধরতে বলেননি, বরং ধৈর্যের বিনিময়ে তার সাহচর্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যখন কোনো মানুষ জানে যে, মহাবিশ্বের অধিপতি তার সঙ্গে আছেন, তখন পৃথিবীর কোনো সংকটই আর তাকে পরাজিত করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ধৈর্যের প্রকৃত রূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রকৃত ধৈর্য কেবল বিপদের প্রথম আঘাতেই প্রকাশ পায়।’ (সহিহ বুখারি ১২৮৩) এর অর্থ হলো, বিপদের শুরুতে হা-হুতাশ করে পরে শান্ত হওয়া ধৈর্য নয়, বরং শুরু থেকেই আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং অবিচল থাকাই হলো সফলতার চাবিকাঠি।

তকদিরের প্রতি সন্তুষ্টি থাকা : মুমিনের জীবনের অনন্য সৌন্দর্য হলো তার তাকদির বা ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস। সে জানে যে, তার জীবনে যা ঘটেছে তা এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না এবং যা ঘটেনি তা কখনো ঘটার ছিল না। এই বিশ্বাস তাকে চরম বিপদেও এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি প্রদান করে। যখন কোনো মুমিন বড় কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হন, তখন তার মুখে উচ্চারিত হয়, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তারই কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে।

এটি আমাদের শেখায়, আমরা যা কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই, যেমন আমাদের পরিবার, সম্পদ, সম্মান সবই আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আমানত। তিনি যখন তার আমানত ফেরত নেন, তখন সেখানে অভিযোগের কোনো অবকাশ থাকে না। মহান আল্লাহ সুরা বাকারার ১৫৬ ও ১৫৭ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করেছেন যে, যারা বিপদের মুহূর্তে এই সমর্পণের নীতি গ্রহণ করে, তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও শান্তি বর্ষিত হয়। এই স্বীকারোক্তি মানুষের ভেতর থেকে হাহাকার দূর করে সেখানে আল্লাহর মহব্বত স্থাপন করে।

নামাজ আদায় : বিপদ যখন পাহাড়ের মতো চেপে বসে, তখন মানুষের বুদ্ধি ও সামর্থ্য হার মেনে যায়। এমন অবস্থায় মুমিনের একমাত্র আশ্রয় হলো নামাজ। নামাজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যম। সংকটকালে মুমিন যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে দুনিয়ার সব কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে তার সব বেদনার ভার অর্পণ করে মহান আল্লাহর চরণে।

হাদিস শরিফ থেকে আমরা জানতে পারি, আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) যখনই কোনো জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখনই তিনি নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন। (আবু দাউদ) কঠিন সময়ে নামাজ মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে। পাশাপাশি দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা একজন মুমিনের প্রধান গুণ। দোয়া অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে। কষ্টের মুহূর্তে বেশি বেশি ইস্তিগফার এবং সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করার মাধ্যমে অন্তরে ধৈর্য ফিরে আসে। কোরআনের সুরা ইনশিরায় বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি’, এটি মুমিনের হৃদয়ে আশার আলো জ¦ালায়।

আত্মসমালোচনা ও তওবা করা : বিপদ অনেক সময় আমাদের জন্য আয়নার মতো কাজ করে। এটি আমাদের নিজেদের ভুলগুলো চিনতে সাহায্য করে। জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় স্রষ্টাকে ভুলে যাই, নানা গুনাহে লিপ্ত হই। বিপদের এই সময়টি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, যা আমাদের থামতে বলে এবং ভাবতে শেখায়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল। আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা ৩০)

এই আয়াতের উদ্দেশ্য মানুষকে হতাশ করা নয়, বরং তাকে সংশোধনের সুযোগ করে দেওয়া। বিপদ এলে একজন মুমিন অন্যের ওপর দোষারোপ না করে নিজের আমলনামার দিকে তাকায়। সে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। এই আত্মসমালোচনা তাকে একজন উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। বিপদ তখন আর অভিশাপ থাকে না, বরং এটি গুনাহ ঝরিয়ে ফেলার এবং জান্নাতের পথ সুগম করার এক মোক্ষম সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

হতাশামুক্ত জীবনযাপন : হতাশা হলো শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সে চায় মানুষ যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়। কিন্তু মুমিন জানে যে, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে চলে আসে। মুমিনের অভিধানে ‘হতাশা’ বলে কোনো শব্দ নেই। সে বিশ্বাস করে, আজকের এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ সুরা ইনশিরার ৬ নম্বর আয়াতে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।

এই বিশ্বাস তাকে প্রতিকূল সময়েও হাসিমুখে পথ চলতে শেখায়। সে ভাবে, আজকের এই অশ্রু হয়তো পরকালের অনন্ত সুখের বীজ হয়ে কাজ করবে। জীবনের প্রতিটি পরীক্ষা তাকে আরও দৃঢ়, আরও অভিজ্ঞ এবং আল্লাহর আরও প্রিয় করে তোলে। পরম তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা তাকে এতটাই আত্মবিশ্বাসী করে যে, কোনো পার্থিব অভাব বা দুর্যোগ তাকে বিচলিত করতে পারে না। সুতরাং মানুষের জীবন এক রৈখিক কোনো যাত্রা নয়। এখানে চড়াই উতরাই থাকবেই। কিন্তু যারা এই চড়াই-উতরাইকে ইমানের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে পারে, তারাই দিনশেষে সফল। ধৈর্য, তকদিরে বিশ্বাস, ইবাদত, তওবা এবং সুদৃঢ় আশা,  এই পাঁচটি মূলনীতিই পারে আমাদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে। বিপদ তখন আর ভয়ের কারণ থাকে না, বরং তা পরিণত হয় মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য সোপানে। মহান প্রতিপালক আমাদের সবাইকে প্রতিটি সংকটে সবর ও শোকর করার তৌফিক দান করুন। আমরা যদি তা করতে পারি, তাহলে আমাদের দুনিয়ার জীবন হবে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। আমাদের মধ্যে কখনো হতাশা কাজ করবে না। কোনো দুশ্চিন্তা আমাদের ঘায়েল করতে পারবে না। এতে আমরা মহান আল্লাহর ইবাদতে আরও একনিষ্ঠভাবে আত্মনিয়োগ করতে পারব। মহান আল্লাহ আমাদের বুঝে শুনে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক