সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে তপ্ত মরুর বুকে যে সভ্যতার সূর্য উদিত হয়েছিল, তা কেবল পুরুষদের বাহুবলেই বিকশিত হয়নি। ইসলামের সেই সোনালি ভোরের কারিগরদের তালিকায় নারী সাহাবিদের নামও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্যমান। ইবাদত ও ঘরোয়া কাজের গণ্ডি ছাপিয়ে তারা জীবনের প্রয়োজনে এবং সমাজ বিনির্মাণে পেশাদারির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা এবং নিজের উপার্জন থেকে দান-সদকা করার মানসিকতা তাদের কাজের প্রধান প্রেরণা ছিল। কেউ যুক্ত ছিলেন হস্তশিল্পে, কেউ ব্যবসায়, আবার কেউ বা কৃষিকাজে। তাদের কর্মতৎপরতা প্রমাণ করে, ইসলামের বিধি-বিধান মেনে পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে নারীদের পেশাগত কাজে যুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। আত্মনির্ভরশীলতা ও কর্মস্পৃহার সেই ধারা আজও মুসলিম নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
কারিগরি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তৎকালীন নারীরা ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। তারা কেবল সাধারণ শ্রম দিতেন না, বরং কাজের তদারকি ও কারিগরি ব্যবস্থাপনায়ও মুন্সিয়ানা দেখাতেন। যেমনটি জানা যায় একজন আনসারি নারী সাহাবির বর্ণনায়। তার মালিকানাধীন এক শ্রমিক কাঠমিস্ত্রির কাজ জানতেন। সেই নারীর নির্দেশ ও সরাসরি তত্ত্বাবধানেই সেই শ্রমিক বনের ঝাউগাছ কেটে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য মিম্বার তৈরি করেছিলেন। (সহিহ বুখারি) এটি স্পষ্ট করে, তৎকালীন নারীরা কেবল গৃহিণী ছিলেন না, বরং নির্মাণ ও কারিগরি কাজের স্বত্বাধিকারী এবং ব্যবস্থাপক হিসেবেও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতেন।
কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও নারী সাহাবিদের পদচারণা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর খালার ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিয়ে বিচ্ছেদের পর তিনি নিজের খেজুর বাগানে গিয়ে ফসল সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ তাকে বাইরে যেতে বাধা দিলেও নবীজি (সা.) তাকে অনুমতি প্রদান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, বাগান থেকে খেজুর সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি দান-সদকা বা কোনো ভালো কাজ করার সুযোগ পাবেন। (সহিহ মুসলিম)
কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পে জয়নব (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী হিসেবে তিনি ঘরে বসে অত্যন্ত নিপুণভাবে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করতেন এবং বাজারে তা বিক্রি করতেন। তিনি নিজেই নবীজিকে জানিয়েছিলেন, তিনি একজন শ্রমজীবী নারী এবং নিজের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান) নিজের বা সন্তানের পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকায় পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করার এই সংগ্রামকে নবীজি (সা.) কেবল সমর্থনই করেননি, বরং এর সওয়াব সম্পর্কেও তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এ ছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেলাইয়ের কাজেও বহু নারী সাহাবি স্বাবলম্বী ছিলেন।
সেবা খাতের কথা বলতে গেলে শিশুদের দুগ্ধদান ও প্রতিপালন ছিল তৎকালীন সমাজের এক স্বীকৃত ও সম্মানজনক পেশা। পবিত্র কোরআনেও এর সপক্ষে নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, যদি তারা তোমাদের সন্তানদের স্তন্যদান করে, তবে তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (সুরা তালাক ৬)
এ ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে আহতদের সেবা শুশ্রূষা এবং পিপাসার্তদের পানি পান করানোর কাজেও নারীরা অগ্রণী ছিলেন। পশু পালনের ক্ষেত্রেও তাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কাব ইবনে মালিক (রা.)-এর এক দাসী পাহাড়ে ছাগল চরাতেন এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে পাথর দিয়ে পশু জবাই করার মতো সাহসিকতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। (সহিহ বুখারি)
চিকিৎসাবিদ্যা ও ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও আনসারি নারীরা নবীজি (সা.)-এর কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি লাভ করেছিলেন। বিষাক্ত প্রাণীর কামড় বা শারীরিক ব্যথায় তারা নিরাময়ের চেষ্টা করতেন। (সহিহ বুখারি)
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক