ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক এখন অস্তিত্ব সংকটে। দিনকে দিন কমছে খাদের কিনারে দাঁড়ানো এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতের সংখ্যাও। এই শতাব্দীর শুরুতেও যেখানে রেশম কারখানার শব্দে সরগরম থাকত, রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকা; সেখানে এখন ব্যস্ততা নেই। হাতেগোনা কয়েকটি কারখানা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। নাম রাজশাহী সিল্ক হলেও এই সিল্ক কাপড়ের অধিকাংশ এখন বোনা হয় বিদেশি সুতায়। মূলত চায়না থেকে আমদানি করা সুতায় বানানো হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্কের কাপড়।
অথচ চাহিদা বেড়েছে রাজশাহী সিল্কের। তবে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ না করার পেছনের প্রধান কারণ সুতার সংকট। আর এই সংকটে রাজশাহীর ৭৬টি রেশম কারখানার মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৮-১০টি কারখানা। যারা টিকে আছে, তারাও ভালো নেই। এদিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম কারখানাও লোকসানের বোঝা নিয়ে বন্ধ হয়ে যায় ২০০২ সালে। পরে রাজশাহীর মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে কারখানাটি ক্ষুদ্র পরিসরে চালু হয়।
রাজশাহী সিল্কের এমন দুর্দিন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেশম শিল্পমালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, ‘মূলত সঠিক পরিকল্পনার অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে রেশম শিল্প।’ তিনি রেশম শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি একটি উন্মুক্ত বাজার তৈরির আহ্বান জানান।
লিয়াকত আলী বলেন, ‘রাজশাহী বিসিকের ৭৬টি বেসরকারি রেশম কারখানার মধ্যে রেশম সুতার অভাবে প্রায় ৭০টি বন্ধ রয়েছে। সরকার যদি বেসরকারি খাতকে রেশম সুতা উৎপাদনের অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে, তাহলে বাংলাদেশ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশে রপ্তানিও করতে পারে।’
তবে রেশম শিল্প নিয়ে নতুন করে আশা জাগিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম। গতকাল শনিবার রেশম শিল্পের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং একে আরও উন্নত করার রূপরেখা তৈরি করতে রাজশাহী রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তিনি বলেছেন, ‘রাজশাহী সিল্ক শুধু রাজশাহীর নয়, এটি সারা বাংলাদেশের সম্পদ।’
রেশম শিল্পের সংকট কাটাতে পলু চাষ, তুঁত গাছের উন্নয়ন এবং রেশম সুতার মান বৃদ্ধিতে গবেষণার ওপর সরকার বিশেষ জোর দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে এবং সিল্কের প্রসার ঘটাতে নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।’ শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে খুব শিগগির সমন্বিত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী রেশম শিল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেছেন, ‘১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজশাহী রেশম বোর্ড স্থাপন করেছিলেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এই বোর্ডের উন্নয়নে নানা কর্মকা- পরিচালনা করেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এই শিল্পকে আধুনিকীকরণ এবং গবেষণার মাধ্যমে আরও উন্নত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘রেশম শিল্প একটি ঐতিহ্যবাহী এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এটির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। এ শিল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত কারিগরি বিষয় জড়িত। ডিম থেকে সুতা উৎপাদন পর্যন্ত সব কার্যক্রম আবহাওয়ার সঙ্গে জড়িত। তাই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বাইরের প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হবে। প্রান্তিক চাষি, বসনীদের সুরক্ষা দেওয়াসহ সব পর্যায়ে জড়িত ব্যক্তিদের এ শিল্পের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাদের দক্ষ জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে হবে। তাদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে।’
চীন ও ভারতের মতো আমাদেরও একটি গুটি থেকে ১৫০০ মিটার সুতা উৎপাদনে সক্ষম হতে হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের নিয়ে রেশম শিল্পের সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে। জনস্বার্থে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ বছর গবেষণার জন্য ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা পূর্বে ছিল ৯ লাখ টাকা।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় ১১ হাজার ৫০০ রেশমচাষি/বসনীকে কার্ডের আওতায় আনার কাজ চলমান রয়েছে। তারা প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন।’ রেশম শিল্পের উন্নয়নে সবার পরামর্শ প্রয়োজন উল্লেখ করে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সবার ঐকান্তিক চেষ্টায় আশা করা যায়, এ শিল্প আবার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। সরকার এ শিল্পের উন্নয়নে সবার ব্রিজ হিসেবে কাজ করবে।’
এর আগে পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. তৌফিক আল মাহমুদ একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মন্ত্রী ও সচিবের কাছে বোর্ডের সার্বিক কার্যক্রম তুলে ধরেন। এ ছাড়া রেশম উন্নয়ন বোর্ডের সভাকক্ষে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে ‘রাজশাহী সিল্কের উন্নয়ন ও বাজারজাতকরণ’বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব বিলকিস জাহান রিমি, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা, জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং রেশম বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।