দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেখানে পর্যটকদের ভ্রমণ সীমিত করা হয়। সরকারের এই এক সিদ্ধান্তেই দ্বীপটির অধিকাংশ দোকানপাট, হোটেল, রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বেকার হয়ে পড়েছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ মানুষ। অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে জীবিকার তাগিদে আশ্রয় নিচ্ছে অন্যত্র। অর্থাভাবে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছেন অনেক বাবা-মা। এক কথায়, সেন্ট মার্টিনবাসীর জীবনে নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়।
গত ৩ এপ্রিল বিকেলে দ্বীপের জেটিঘাটসংলগ্ন বাজারে এলাকাবাসীর আয়োজনে পর্যটকদের সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপবাসী সূত্রে জানা যায়, দ্বীপের বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন। ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যটন মৌসুম। দ্বীপে দুই বছর ধরে পর্যটকদের ভ্রমণ সীমিত থাকায় কর্মহীন হয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন সেখানকার হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ডাব ব্যবসায়ীসহ অন্য বাসিন্দারা। ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, কিন্তু বর্তমানে আয় বন্ধ থাকায় রিসোর্ট বিক্রি বা দ্বীপ ছাড়ার উপক্রম হয়েছে তাদের। এর মাঝে নতুন করে চলতি মাসের ১৫ এপ্রিল থেকে সরকার মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফলে সাগরে মাছ শিকারের যেতে পারবেন না জেলেরা। ট্যুরিজমের পাশাপাশি মৎস্য আহরণ বন্ধ থাকায় দ্বীপের সাধারণ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
দ্বীপে ঘুরে বেড়ানো বেওয়ারিশ কুকুরগুলোর খাদ্যের উৎস পর্যটকদের উচ্ছিষ্ট খাবার। পর্যটক না থাকায় তাই কুকুরের খাবারেও সংকট দেখা দিয়েছে। না খেয়ে মারা যাচ্ছে অনেক কুকুর।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, দ্বীপে ১০ হাজার মানুষের বাস। ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৫৬। বাসিন্দাদের অনেকেই জীবিকার তাগিদে এলাকা ছেড়েছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও টেকনাফ এলাকায়।
ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত সরকার পরিবেশের দোহাই দিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপবাসীকে ভাতে মারার ফন্দি আঁটে। বছরে চার মাস আবহাওয়া শান্ত থাকে, এ সময়েই পর্যটকরা দ্বীপে যান। বাকি আট মাসে দ্বীপের পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। কিন্তু সেটা না করে, ১০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা স্থবির করতে একপেশে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিগত সরকারের ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও আন্দোলন করছেন স্থানীয়রা। কিন্তু তবুও সরকার বুঝেনি জনগণের ভাষা।’
সেন্ট মার্টিন বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিব খান বলেন, দ্বীপে পরিবেশ সুরক্ষার নামে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের কারণে স্থানীয়দের জীবিকা ও ব্যবসায়িক কর্মকা-ে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিধিনিষেধের কারণে অধিকাংশ হোটেল বন্ধ এবং হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকে কক্সবাজার ও টেকনাফ শহরসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ব্যবসা এবং কাজকর্ম করে কোনো রকম পরিবার চালাচ্ছেন। তিনি জানান, অধিকাংশ বাসিন্দা পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিধিনিষেধের কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আইনজীবী এম কেফায়েত উল্লাহ খান বলেন, এক সময় দ্বীপের মানুষ মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এখন তারা সম্পূর্ণভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্রসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রায় সবকিছুই এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়তে পারে এবং সমাজে নেতিবাচক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে, যা সামগ্রিকভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমরা সেন্ট মার্টিনবাসী চলতি মাসের জন্য হলেও ভ্রমণে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
সেন্ট মার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মদন কান্তি রুদ্র বলেন, দ্বীপের লোকজন পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের স্কুলে ৩০০ ছাত্রছাত্রী। ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের উপস্থিতি বেশি। ছাত্রদের অনেকেই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের জন্য কক্সবাজার, টেকনাফ চলে গেছে।
সেন্ট মার্টিনের হোটেল ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, দ্বীপবাসী ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হতে চান না; তারা কাজ করে, সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করতে চান। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্বীপবাসীর জন্য কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
টেকনাফ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বন্ধ্যত্বকরণ কর্মসূচি না থাকায় এই দ্বীপের কুকুরের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দ্বীপের কুকুরগুলো স্থানীয় বাসিন্দা ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবারের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু পর্যটক না থাকায় দ্বীপে হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ। ফলে কুকুরের খাবারের উৎসও কমে গেছে। আবার বর্ষায় ইঁদুরসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে বিভিন্ন খাবার পেলেও শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক উৎস থেকে কুকুর তেমন খাবার পায় না। এ কারণে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম আরও বলেন, সেন্ট মার্টিনের বেশিরভাগ বাসিন্দার আয়ের একমাত্র উৎস পর্যটন। বর্তমানে পর্যটকের অভাবে আয়-রোজগার না থাকায় দ্বীপের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আবার রাত-দিন দ্বীপে আড়াই হাজার কুকুর বিচরণ করছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। বাসিন্দারা প্রায়ই কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আবার কুকুরসহ অন্যান্য অবলা প্রাণীরও খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু পর্যটন মৌসুম শুরু হতে এখনও অনেক সময় বাকি, তাই অন্তত চলতি মাসে এক মাসের জন্য জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এতে দ্বীপের মানুষ কিছুটা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে এবং সেই আয়ে বাকি সময়টুকু জীবিকা নির্বাহে সক্ষম হবে।