পেপাল চালু ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে পরিকল্পনা

মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্র্রতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সাতটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল ও রাশিয়া। এসব দেশের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে সরকার।

গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে উচ্চপর্যায়ে সফরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে শ্রমবাজার অনুসন্ধান করে বাংলাদেশি কর্মীর পেশাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী দেশভিত্তিক স্থানীয় লবিস্ট, বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার বাজার পুনরায় উন্মুক্ত করতে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে থাইল্যান্ডে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা থাকায় দেশটিতে কর্মী পাঠানোর হার বাড়াতে জাপানি ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ৫৩টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (টিটিসি) জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়ান, আরবি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষা প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৪১ জন ভাষা প্রশিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসূফ আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এ মাসের ৮-১১ তারিখ দেশটি সফর করেছেন। এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হবে।

প্রাথমিকের শিক্ষকদের ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব : সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ইশতেহারে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষাদানের মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৯ জন এবং তার মধ্যে চলমান ‘চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’র আওতায় ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষককে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি জেনে আনন্দিত হবেন যে, আগামী ১ জুলাই থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি “পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি” শুরু হতে যাচ্ছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে অবশিষ্ট শিক্ষকদের ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে।’

জনগণকে ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়ার উদ্যোগ : সদস্য মো. শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় জনগণকে “ই-হেলথ কার্ড” প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ক একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৮০ দিনের মধ্যে পাঁচটি জেলার (খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী) জনসাধারণকে ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান কার্যক্রম শুরু করা হবে। এই ই-হেলথ কার্ড বষবপঃৎড়হরপ ঢ়ধঃরবহঃ ৎবভবৎৎধষ ংুংঃবস এবং বষবপঃৎড়হরপ ঢ়ধঃরবহঃ সধহধমবসবহঃ ংুংঃবস-এর সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, সারা দেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গঠিত কমিটি কাজ করছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় যথাক্রমে আট বিঘা ও ১০ বিঘা করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

পেপাল চালু করতে কার্যকর উদ্যোগ : জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপালের কার্যক্রম শুরু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাই-টেক পার্ক ও আইসিটি সেন্টারগুলোর কার্যকর পরিচালনা এবং দেশে পেপালের কার্যক্রম চালু করতে ইতিমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

লাভজনক হলে কুয়াকাটায় বিমানবন্দর : পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপি এ বি এম মোশাররফ হোসেনের সম্পূরক এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো প্রাইভেট কোম্পানি ফ্লাইট অপারেট করলে কুয়াকাটায় বিমানবন্দর করা হবে। কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র আছে, একটা নৌ-ঘাঁটি আছে। ওখানে একটি ক্যান্টনমেন্ট আছে, পায়রা বন্দর আছে। সেখানে একটি বিমানবন্দর করা গেলে কুয়াকাটাকে হয়তো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে পারব।’

বিমানবন্দর করা যায় কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের বিষয়টি অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিমানের ফ্লাইট অবশ্যই সেখানে পরিচালনা করা যেতে পারে। কিন্তু, সেটি যদি লস হয় তাহলে তো পাবলিকের পকেট থেকে পয়সাটা যাবে। কাজেই সেটি বোধহয় বিজনেস ওয়াইজ খুব একটা ভালো হবে না। কোনো প্রাইভেট কোম্পানি যদি সেখানে ফ্লাইট অপারেট করতে চায়, আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে তাকে অবকাঠামোটা যতটুকু সম্ভব তৈরি করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করব। তবে, অবশ্যই যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে আমাদের এটি করতে হবে। আমরা চাই না, কোনো উদ্যোগ ব্যর্থ হোক।’

বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার সমুদ্র অঞ্চল পরিকল্পনা কার্যক্রম এবং এ থেকে দেশের সম্ভাব্য অর্জনের বিষয় বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। সামুদ্রিক সম্পদ, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাসহ সুনীল অর্থনীতির টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজন হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।

২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রী : জ্বালানি সংকট এরই মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল সহায়তা চেয়েছেন, যাতে এ সংকট মোকাবিলা ও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা যায়।

গতকাল এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি প্লাস অনলাইন সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি জরুরি পদক্ষেপ, ঐক্য ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত দাবি করে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্মেলনের যৌথ অগ্রাধিকারের শীর্ষে থাকা উচিত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করতে চায়। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানাই।’