চাকরিতে যোগদান করে দুই মাস ধরে কাজ করার পরও চাকরি হারাতে হচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাত ইমারত পরিদর্শককে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে আবেদন যাচাই-বাছাই করে প্রবেশপত্র ইস্যু, নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য আহ্বান, লিখিত পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষার পর সর্বশেষ যোগদান করানোর পর এখন বলা হচ্ছেএরা অযোগ্য। চাকরিতে যোগদান করানোর পর এখন আবার অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছেএই দায় কার?
গত ২১ অক্টোবর সিডিএ ৩১টি পদে লোক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেই বিজ্ঞপ্তির ১৭ নম্বর ক্রমে ছিল ইমারত পরিদর্শক পদে ১৮ জন লোক নিয়োগের কথা। গত ১৭ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষার পর ২৫ জানুয়ারি মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে সেদিনই নির্বাচিত ১৮ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ তালিকা অনুযায়ী, সিডিএর তৎকালীন সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাদের যোগদানপত্র ইস্যু করা হয় এবং ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্বাহ্নে যোগদান করতে বলা হয়। যথারীতি তারা যোগদান করে কাজও করতে থাকে। কিন্তু গত ২ এপ্রিল সিডিএর বোর্ড সভায় তাদের অনেকের আবেদন সিডিএর অর্গানোগ্রামের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী হয়নি বলে নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করা হয়। ২ এপ্রিলের বোর্ড সভায় তাদের সাত কর্মদিবসের মধ্যে এইচএসসি পাসের সনদপত্র জমা দিতে বলা হয়। অন্যথায় তাদের নিয়োগ বাতিলের সিদ্বান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৮ জন ইমারত পরিদর্শকের মধ্যে সাত জন ইমারত পরিদর্শক এইচএসসি পাসের সনদপত্র জমা দিতে পারেনি। যেহেতু সরকারের অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেনি, তাই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু যে সাতজনকে বাতিলের বিষয়ে সিদ্বান্ত নেওয়া হয়েছে, তাদের বক্তব্য হলোআমরা সিডিএর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ করে আবেদন করেছি। তাই অবৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে পরিদর্শক পদে নিয়োগ পাওয়া মোছা. শাকিরা আক্তার বিথী (রোল নম্বর-২০০১৩১) বলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হতে সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আমাদের উভয় যোগ্যতাই রয়েছে।
তাহলে সমস্যা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস হতে হবে। কিন্তু এই সাতজন এসএসসি পাসের পর উচ্চমাধ্যমিক পাস না করে সার্ভে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে পাস করেছে। যদি বাকি নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী সনদপত্র দিতে না পারত, তাহলে কমিটি তা বিবেচনা করত। কিন্তু ১৮ জনের মধ্যে বাকি ১১ জন যেহেতু অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী যোগ্যতার পক্ষে সনদপত্র দিতে পেরেছে, তাই যারা দিতে পারেনি তাদের অযোগ্য বিবেচিত করেছি।
পরিদর্শক পদে নিয়োগ পাওয়া অনয় সিংহ সুজাত (রোল নম্বর ২০০১২৫) বলেন, সিডিএ থেকে আমাদের এইচএসসি পাসের সনদপত্র জমা দিতে বলেছে। আমরা যেহেতু এসএসসি পাসের পর চার বছরের ডিপ্লোমা ইন সার্ভে কোর্স থেকে পাস করেছি, তাই কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে আমাদের এই পাসকে এইচএসসি পাসের সমমান বিবেচনা করা হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে আনা সমমানের সেই সনদ সিডিএতে জমাও দিয়েছি। এ ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও সমমান বলা হয়েছিল। তাই আমাদের অবৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট কুমিল্লার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোবারক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সিডিএর অর্গানোগ্রামে থাকা সার্ভে ফাইনাল কোর্স আর দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নেই। চার বছরের ডিপ্লোমা-ইন-সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং এইচএসসি পাসের সমমান। তারপরও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যদি এইচএসসি বা সমমান লেখা না থাকত, তাহলে তা অবৈধ হতো। যেহেতু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা আবেদন করেছে, তাই এখানে অবৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই। দেশের বেশিরভাগ সংস্থা তাদের অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করেছে, সিডিএ পরিবর্তন করে নিলেই পারত।
তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তের আলোকে আবেদনপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করা, প্রবেশপত্র ইস্যু করা এবং মৌখিক পরীক্ষার সময় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সব সনদপত্র আছে কি না দেখে নিয়োগপত্র ইস্যু করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন সিডিএর বোর্ড সদস্য ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, সিডিএর নিয়োগ কমিটিকে আরও বেশি প্রফেশনাল হওয়া প্রয়োজন ছিল। এদের চাকরি দিয়ে আবার চাকরি থেকে বাদ দেওয়া বিষয়টি শোভনীয় হচ্ছে না। যদিও আইন অনুযায়ী বাদ দেওয়ার প্রবিধান রয়েছে, তারপরও মানবিক বিবেচনায় তা সুন্দর হয় না।
অর্গানোগ্রাম ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কি এক? : এখন প্রশ্ন হলো সিডিএর অর্গানোগ্রাম ও প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কি একই আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের ৩০ জুলাই প্রকাশ হওয়া সরকারি গেজেটে ইমারত পরিদর্শকের শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করা হয় এইচএসসি এবং সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় পাস হতে হবে। অপরদিকে গত ২১ অক্টোবর সিডিএর সচিব স্বাক্ষরিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ইমারত পরিদর্শকের যোগ্যতা চাওয়া হয় উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট কুমিল্লার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোবারক হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ২০০৪ সালে শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়ায় এখন আর সার্ভে ফাইনাল কোর্স বলতে কিছু নেই। আগে এক বছরের সিট কোর্স, দুই বছরের সার্ভে ফাইনাল কোর্স, ৩ বছরের ডিপ্লোমা কোর্সের পর এখন চার বছরের ‘ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভে’ কোর্স পড়ছে শিক্ষার্থীরা। মাঝখানে এক, দুই বা তিন বছরের জন্য কোনো সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। আর এই ডিপ্লোমা কোর্স এইচএসসি সমমান।
নিয়োগ অনিয়ম নিয়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ : অপরদিকে সিডিএর এই নিয়োগ কার্যক্রমে অসংখ্য অনিয়ম হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। গত ২৯ জানুয়ারি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন নামে একজন আবেদনকারী। অফিস সহায়ক পদে আবেদনকারী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সিডিএ এ নিয়োগ কার্যক্রমে অনেক অনিয়ম করেছে। একজন প্রার্থী একাধিক পদে আবেদন করতে পারবে না তা উল্লেখ করেনি। যথারীতি আমি একাধিক পদে আবেদন করি কিন্তু একই সময়ে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ায় আমি একটা ছাড়া বাকিগুলোতে আবেদন করতে পারিনি। সিডিএর অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী অনেক পদে লিখিত পরীক্ষার কথা না থাকলেও সেগুলোতে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। আমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি নিয়োগ কার্যক্রম দেখতে সিডিএতে গত ২ এপ্রিল আসার কথা ছিল। কিন্তু এখনো ওই কমিটি আসেনি।’ গত ২৪ মার্চ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগ-১ এর সিনিয়র সহকারী সচিব আম্বিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত নোটিসে বলা হয়, অভিযোগকারী ও সিডিএ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য শোনার জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটি সিডিএতে ২ এপ্রিল সরেজমিন উপস্থিত থাকবে।
উল্লেখ্য, অনেক বছর পর সিডিএ নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করলেও এ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত শুরু হয়।