অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়ায় স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংকট এসেছে। এখন তার প্রভাবে দেশজুড়ে নেমেছে হামের টিকার অভাবে শিশুমৃত্যু। কয়েক দিনের মধ্যে অনেক শিশু মারা গেছে। এ মৃত্যুর দায় কার? যারা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) পাল্টে নিয়েছেন, যারা ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারাই মূলত দায়ী এ মৃত্যুর জন্য। একটি চলমান ব্যবস্থাকে হঠাৎ করে বাতিল করার আগে এটা ভাবা উচিত ছিল ওপেন টেন্ডারে টিকা কিনতে কত সময় লাগতে পারে। এই দায় অন্তর্বর্তী সরকার কোনোভাবে এড়াতে পারে না। এটা সবারই জানা যে, সরকারি দপ্তরের কর্ম-গতি কচ্ছপের মতো ধীর আর জটিল। যা আইনি প্যাঁচের অন্তর্গত। তারা রোগাক্রান্ত পরিস্থিতিকে গায়ে মাখেন না।
রাজধানী এবং দেশের জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি ভালো বলা যাবে না। সেবাগ্রহীতার প্রশ্নে সেবাদানকারীদের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি বিভিন্ন যন্ত্রের অভাব ও বিকল হয়ে পড়ার ঘটনা রয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালে টেকনিশিয়ানের অভাব ও অদক্ষতার প্রশ্নটি তোলা হচ্ছে না। স্থান সংকুলানের অভাবে হাসপাতালের মেঝেতে শিশু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জায়গা সংকটের পাশাপাশি, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা বলতে গেলে নেই। স্বাস্থ্যসেবার এই অপ্রতুলতায়, বেসরকারি হাসপাতালগুলো রমরমা ব্যবসা করছে। আর সে কাজে সহযোগ দিচ্ছে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এই ওপেন-সিক্রেট সরকার যেমন জানে, জনগণও জানে। কিন্তু এ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার যেন কেউ নেই। অপারেশনাল প্ল্যান বদলাবার আগে কর্তৃপক্ষকে এটা ভাবা উচিত ছিল সামনের দিনগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ আছে কী নেই। এটা তারা কখনোই ভাবেননি বলেই আগ-পিছ না জেনে, না বুঝে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে কসুর করেননি। সেই সিদ্ধান্তে যাওয়ার পেছনে যে অনৈতিক চিন্তা ছিল, কমিশন নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতি এমন যে, আগামী দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন। শঙ্কা রয়েছে ডিপথেরিয়া, টিবি, ধনুস্টংকার, হুপিংকাশির প্রাদুর্ভাবের। তারা বলছেন, অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় ‘ওপি’ বন্ধ করার ফলে স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
টিকা কার্যক্রমে ভাটা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের বেতন বন্ধ সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এটি ছিল অন্তর্র্বর্তী সরকারের অবৈজ্ঞানিক ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত। যার নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান এবং ভবিষ্যতে তা ভয়াবহ হতে পারে। এই থমকে যাওয়া খাতে গতি ফেরাতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগে টিকা কেনা হতো ইউনিসেফ থেকে। অন্তর্র্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, অর্ধেক ইউনিসেফ আর বাকি অর্ধেক ওপেন টেন্ডারের মাধমে কিনবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি)। গত ১৬ এপ্রিল শেষ ব্যাচের টিকা শুরু হয়েছে, যা শেষ হতে তেমন সময় লাগবে না। এর মধ্যেই হামের রোগীতে বিভিন্ন হাসপাতালে কান্নার রোল চলছে। চিকিৎসা সামগ্রীর অপ্রতুলতা আর সেবাদানকারীদের সেবার প্রতি অমনোযোগ ইত্যাদি পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। এপ্রিলে পেন্টাভ্যাক্স এমএম, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি এবং টিটেনাসসহ সব শেষ হওয়ার পথে। এই সংকট সমাধানে সরকার নতুন করে টিকা কেনার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তবে এত মৃত্যুর পর তা হতে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সরকার একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দায়ীদের খুঁজবে। কাদের অবহেলা ও ভুল সিদ্ধান্তের ফলে এমন মারাত্মক পরিস্থিতির কারণ হলো, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।