দাড়ি গোঁফঅলা একটা ভূতনাথ ছিল সে।
পাগলা পাগলা দেখতে।
তার কি দাড়ি গোঁফে উঁকুন হয়েছিল?
দাড়ি গোঁফ ডিলিট করে দিয়েছে। তাতে তাকে যা মনে হচ্ছে, যেমন দেখাচ্ছে, সেটা এক কথায় কহতব্য নহে। দুই-চার কথা বলে শেষ করতে হবে। দাড়ি গোঁফ মু-িত তাকে সমুদ্র শসার মতো দেখাচ্ছে। সামুদ্রিক প্রাণী সমুদ্র শসা—গুগলে, ইউটিউবে আছে। নেটিজেন যারা দেখবেন, তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। সে সমুদ্র শসার মতো দেখতে কি না—‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়া যাবে। গ্যারান্টি সহকারে বলা যায় যে, বিরানব্বই ভাগ ভোট পেয়ে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবে।
আমার করোনা হয়েছিল। করোনার পর ডেঙ্গু হয়েছিল। ডেঙ্গুর পর চিকুনগুনিয়া হয়েছিল। গত মাসে ‘তিন দিনের জ¦র’ হয়েছিল। দুনিয়াদারি থেকে বিচ্ছিন্ন আছি বহু দিন। সবিশেষ কিছু দেখি নাই, শুনি নাই। এই ফাঁকে সমুদ্র শসা হয়ে গেছে সে। কী দুঃখের কথা। আমি তার রূপমুগ্ধ ছিলাম না বটে, কিন্তু এই দশা আশা করি নাই।
এ কি অবতার
সমুখে আমার!
‘তোমার কি দাড়িতে উঁকুন হয়েছিল?’
‘আট-নয় বছর আগে। অমলতাসের মা একদিন রেকর্ড পরিমাণ সাতচল্লিশটা উঁকুন হত্যা করেছিল।’
‘স্নাইপার রাইফেল দিয়ে?’
‘না, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে। সে তখনো অমলতাসের মা হয় নাই।’
‘তুমি দাড়ি গোঁফ কেটে ফেলেছিলে?’
‘আরে না! সিলভিয়া উঁকুন নাশক ইংলিশ শ্যাম্পু এনে দিয়েছিল। সব উঁকুন সবংশে নাশ হয়ে গেছে।’
‘অ। মাত্রাতিরিক্ত খুশকি হয়েছিল নাকি?’
‘কোনো দিন না। তুমি এসব কথা কেন বলছ? এটা কি চিকুনগুনিয়ার আফটার এফেক্ট? বা ডেঙ্গুর? বা করোনার? তোমার মাথায় উঁকুন ঢুকে গেছে। খুশকি ঢুকে গেছে।’
আমি তাকে বলতে পারলাম না, তুমি সমুদ্র শসা হয়ে গেছ দেখতে। নেহা ডল তোমাকে দেখলে ডিফারেন্ট কিছু মনে করতে পারে। মুমতাহিনা জাহান তোমাকে দেখলে ডিফারেন্ট কিছু মনে করতে পারে। অনলাইনের হট প্রপার্টি এরা। ব্যাপার।
সে বলল, ‘তোমার কী মনে হয়? কিছু হবে?’
‘কিছু না কিছু সবসময় হয়।’
‘আমি আর কিছু বানাতে পারি না। কিছু হয় না।’
‘এটা তোমার একার সমস্যা না। পৃথিবীতে প্রকৃত সারস আর নাই।’
কিঞ্চিৎ খেপে গেল সে, ‘তুমি কবিদের মতো কথা বলছ কেন? তুমি কি কবি?’
‘মাথা খারাপ! পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো কবিতা আমি জন্মে পড়ি নাই।’
‘আমার কবিতা?’
‘মনে দুঃখ নিও না। পড়ি নাই।’
‘তবে আমার বই কিনো কেন তুমি?’
‘রাশমিনা তোমার কবিতা পড়ে।’
‘রাশমিনা কে?’
‘গৃহকর্মী। বিলকিস ফুপু নিয়োগ দিয়েছেন আমার হিতার্থে। রাশমিনা আমার ঘরদোর ঝাটপাট দেয়, কাপড়-চোপড় ধুয়ে শুকিয়ে পাট করে ওয়ারড্রোবে রাখে।’
‘তোমার ইনার?’
‘তুমি জানো আমি ওসবে নাই। রাশমিনার বয়স ছাব্বিশ। মফস্সলের কলেজে এক বছর পড়েছে। বিয়ে হয়েছিল। বিয়েটা ওয়ার্ক করে নাই। রাশমিনাকে গোপনে বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে আসে সেলিম। ইতিমধ্যে তাদের তিন কন্যা হয়েছে। আরও এক কন্যা হতে পারে। বা পুত্র।’
‘যমজ হতে পারে।’
‘হতেই পারে। তিন কন্যা পেটে নিয়ে রাশমিনা তোমার কবিতা পড়েছে। পরবর্তী সন্তান বা সন্তানদ্বয় পেটে নিয়ে পড়বে। এটা তুমি কবি হিসেবে তোমার একটা ভূমিধস সার্থকতা বিবেচনা করতে পারো।’
‘তুমি বলছ রাশনিমা আমার কবিতা বুঝে?’
‘রাশনিমা না রাশমিনা। রশোমন ফ্লেভার। রশোমন। রাশমিনা। তিন সন্তান প্লাস আপকামিং আরও একটা বা দুইটা সন্তানের জননী রাশমিনা নিশ্চয়ই না বুঝে তোমার কবিতা পড়ে না। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে সে। বিনয় মজুমদার নামে একজনের কবিতা পড়ে।’
‘বিনয় মজুমদার পড়ে! সেই মেয়ে আমার কবিতা পড়ে! তোমার ইতরপনা ক্রসড অল দা লিমিটস। বিনয় মজুমদার নামে একজন! তুমি হত্যাযোগ্য হয়ে উঠেছ।’
‘কেন? বিনয় মজুমদার তোমার পরিচিত কেউ?’
‘প্রকৃত সারসের কথা কে তোমাকে বলল?’
‘প্রকৃত সারসের সাথে বিনয় মজুমদারের সম্পর্ক কী? বিনয় মজুমদার সোশ্যাল মিডিয়ায় আছেন?’
‘বিনয় মজুমদার সর্বভূতেষু। সর্বত্র বিরাজমান।’
‘বিনয় মজুমদার শূন্যতা বলছ? সর্বভূতেষু নিশ্চয়ই একমাত্র শূন্যতা।’
‘এই, তোমার কী হয়েছে? তুমি এভাবে কথা বলছ কেন? রতœখনির সাথে তোমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে নাকি?’
‘রতœখনি না রতœমনি।’
‘তুমি তার রতœভা-ার দেখেছ। সে নিম্ফেট, তুমি পিডো। এটা তোমার মধ্যে হতাশা-নিরাশার একটা প্রগাঢ় বীজতলা বানিয়ে নিয়েছে হয়তো। এহ! প্রকৃত সারস অথবা শূন্যতার কথা বলছ তুমি অক্লেশে—ধরতে পারছ না এই মনোবিকলন।’
‘রতœমনি কক্সবাজারে গেছে। তার একটা আইফোন দরকার। ম্যাক্স প্রো ফিফটিন। কক্সবাজারে আইফোন ফ্রিতে পাওয়া যায়। আমি এটা নিয়ে বিচলিত না যতটা বিচলিত তোমার দাড়ি গোঁফ নিয়ে। দাড়ি গোঁফে তোমাকে মানাত।’
‘পাস্ট টেন্সে কথা বলছ কেন?’
‘তুমি এটা কেন করেছ? ক্লিন শ্যাভেন কেন হয়েছ?’
‘ক্লিন শ্যাভেন? আগা মাথা নাই এসব কী বলছ তুমি? আমি ক্লিন শ্যাভেন হলাম কোন দিন? তুমি কি আমার দাড়ি গোঁফ দেখতে পাচ্ছ না?’
‘বলতে বাধ্য হচ্ছি, দাড়ি গোঁফ ছাড়া তোমাকে দেখতে সমুদ্র শসার মতো লাগছে।’
‘বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি চোখের মাথা খেয়েছ। কিংবা এটাকে কী বলা যায়, করোনা, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া তোমাকে সাইকাডেলিক করে রেখে গেছে।’
‘পরিস্থিতি কিছু করে রেখে যায় নাই?’
‘পরিস্থিতি কীসের?’
‘ন্যারেটিভমূলক।’
‘ন্যারেটিভমূলক। বুঝে গেছ তুমি, মিস্টার আট পার্সেন্ট?’ সে হাসল।
আট পারসেন্ট না আর্ট পারসন বলল? আমি কোনো দিনই আর্ট-টার্টের ধারেকাছে নাই। আরে! আমি দেখলাম তার দাড়ি গোঁফ আছে।
সে কি ইলুশনিস্ট?
‘মিস্টার আট পারসেন্ট।’
গুলি করল সে। ৭.৬২ এমএম ক্যালিবারের বুলেট। বুলস আই হিট। আমি প্রকৃত সারস হয়ে গেলাম। অথবা শূন্যতা।