গত ১৭ বছর সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বগুড়ায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার বগুড়ায় সরকারি সফরে আসছেন তারেক রহমান। তার এ সফর ঘিরে বগুড়াবাসীর মধ্যে ব্যাপক উৎসবের আমেজ ও আশার আলো দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচনসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করবেন। স্থানীয় নেতাকর্মী ও বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু একটি রাজনৈতিক সফর নয়; বরং দীর্ঘ সময়ে বগুড়াবাসীর যে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তা নতুন ডানা মেলার সুযোগ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা এবার আশায় বুক বাঁধছেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে বগুড়ার উন্নয়ন যেমন বৃদ্ধি পাবে, ঠিক তেমনি বগুড়ার মানুষের বহুদিনের না পাওয়া প্রত্যাশাগুলোও পূরণ হবে। তবে বগুড়াবাসী মনে করছেন, আগের সরকারগুলোর মতো শুধু ঘোষণার মধ্যে থেমে না থেকে তারেক রহমানের সরকার প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেবেন।
জানা গেছে, গেল ১৬ বছরে জেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দ, বিশেষ উন্নয়নকাজ আনতে ব্যর্থ হন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, জাপা ও জাসদের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা। স্থানীয়দের তারা বারবার আশার কথা শোনালেও এ সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই।
জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন ক্ষমতায়, তখন তারেক রহমানের হাত ধরে বগুড়ায় হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানাসহ ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- সম্পন্ন হয়। সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা ও বিমানবন্দর স্থাপনসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পগুলো থমকে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, জেলার উন্নয়নে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণিজ্যিকভাবে বিমানবন্দর চালু, দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগর স্থাপন, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ স্থাপন, সবজি হিমাগার নির্মাণ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও চরগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট স্পট নির্মাণ, সার কারখানা স্থাপন, জেলায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আধুনিকায়ন, শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ ফিরিয়ে আনা, করতোয়া নদী সংস্কারসহ শহরের যানজট নিরসনে নতুন বাস ও ট্রাক টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেবেন। এ ছাড়া শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্ক ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করতেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্ব দেবেন।
শিক্ষানগরী হিসেবে বগুড়ার অবস্থান প্রসঙ্গে জেলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কবি ও প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার বলেন, ‘বগুড়া আরও অনেক আগে শিক্ষানগরীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বগুড়ায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়নি। ২০০৫ সালে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকার। কিন্তু পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।’ তিনি বগুড়ায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও অন্তত চারটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানান।
জাতীয় ক্রিকেট দলে বগুড়ার কৃতী সন্তান মুশফিকুর রহিম, শফিউল ইসলাম সুহাস, তাওহিদ হৃদয়, তানজিদ তামিমদের উজ্জ¦ল উপস্থিতি থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় দীর্ঘদিন শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামে কোনো ম্যাচ হয়নি। অযত্ন-অবহেলায় স্টেডিয়ামটি হারিয়েছে আন্তর্জাতিক মানের মাঠের মর্যাদা। আইসিসির তালিকা থেকেও বাদ পড়েছে।
বগুড়া স্পোর্টস রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা মোগল বলেন, ‘ক্রিকেট আমাদের যে পরিচিতি এনে দিয়েছে, সেখানেও রাজনীতি এনে কলুষিত করা হয়েছে।’ তিনি শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়ামকে আবার আন্তর্জাতিক ভেন্যুর মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় ক্রিকেট ও ফুটবলের উন্নয়নের দাবি জানান।
পরিবেশের উন্নয়নে বগুড়া শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদীর সংস্কার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি প্রকৌশলী মো. সাহাবুদ্দিন সৈকত করতোয়া নদীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে এনে দখল-দূষণমুক্ত করে নদীতে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
সংস্কৃতিতে অন্যান্য জেলার চেয়ে এগিয়ে থাকা বগুড়ায় সাংস্কৃতিককর্মীদের জন্য কয়েকটি মুক্তমঞ্চের দাবি জানান বগুড়া থিয়েটারের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ খন্দকার।
বগুড়ার তৈরি পাটজাত পণ্য, হাতে তৈরি সুতি টুপি, রাইস ব্যান ওয়েল, হালকা প্রকৌশল কৃষিজাতপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্য উৎপাদন হচ্ছে নিয়মিত। এসব পণ্যের বাজার রয়েছে দেশের বাইরে। শুধু এশিয়া নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে বিদেশে রপ্তানি করতে বেগ পেতে হয় জানিয়ে বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, ‘বগুড়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা নিয়মিত তাদের পণ্য রপ্তানি করছে। কিন্তু বগুড়ায় বিমানবন্দর না থাকায় বিদেশি ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানালেও তারা সড়কপথে বগুড়ায় আসতে চান না।’ তিনি অতিদ্রুত বগুড়ায় বিমানবন্দর চালু এবং মালবাহী কার্গো বিমান ওঠানামা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেন।
জানা গেছে, বগুড়ার মহাস্থানসহ আশপাশ এলাকায় প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টন সবজি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে আলু, ফুলকপি, মুলা, লাউ, সজনে ডাঁটা, বেগুন, করলা, পেঁপে, পাতাকপি, ঝিঙে, পটোল, গাজর অন্যতম। বগুড়ার শিবগঞ্জের সাদুরিয়া এলাকার ব্যবসায়ী বদিউজ্জামান জানান, তিনি চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৫০ হাজার কেজির বেশি আলু পাঠিয়েছেন।
তিনি বলেন, বগুড়ার অনেক সবজি বিদেশে রপ্তানি হয়। কিন্তু সঠিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকায় বেশি পাঠানো যায় না। বগুড়ায় বিমানবন্দর স্থাপন এবং মালবাহী কার্গো বিমানের ব্যবস্থা রাখা গেলে আরও বেশি সবজি রপ্তানি করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি জেলায় আরও সবজি হিমাগার স্থাপনের ওপরও জোর দেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ন ইসলাম তুহিন বলেন, বগুড়ায় সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। শহরটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রয় হয়। মাদক ও জুয়ার কারণে অনেকে বিপথে চলে গেছে। এসব নির্মুলে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। অতিদ্রুত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে। শহরের মাঝে রাস্তা দখল করে ফুটপাত ব্যবসায়ীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ও পকেটমারদের পুনর্বাসনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জেলার উন্নয়ন নিয়ে সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখা বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশাহ বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়াকে মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার সব প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সেসব কবর দিয়ে দেয়। এর আগে বগুড়ায় যেটুকু উন্নয়ন, তা বিএনপির আমলেই হয়েছে। এবার বগুড়ার মানুষ উন্নয়নের স্বাদ পেতে চায়। ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী আসছেন। ওই দিন বগুড়ার উন্নয়নে পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার মধ্য দিয়ে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা শুরু হবে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি উন্নয়নকাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা এবার লাঘব হবে।