প্রাণ যায় যায় মাতামুহুরীর

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ মাতামুহুরি নদী গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। একসময় পাহাড়ি ঢলের খরস্রোত, গভীর জলধারা, নৌ চলাচলের উপযোগিতা, সেচনির্ভরতা এবং দেশি মাছের প্রাচুর্যের জন্য নাম ছিল এ নদীর। এখন সে সমৃদ্ধি লুপ্তপ্রায়। দীর্ঘদিন পলি জমে, অবৈধ দখলে থেকে, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণে এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে নদীটি বহমানতার সংকটে নিমজ্জিত।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নদীটির প্রস্থ অঞ্চলভেদে ভিন্ন। উজানের পার্বত্য এলাকায় নদীটি তুলনামূলকভবে সরু। অনেক স্থানে প্রস্থ ৫০ থেকে ১৫০ মিটার। সমতল ভূমিতে চকরিয়া অংশে প্রস্থ ২০০ থেকে ৪০০ মিটার। তবে পলি জমা, চর সৃষ্টি হওয়া ও কৃত্রিম বাঁধের কারণে অনেক জায়গায় নদীটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নিম্ন অববাহিকা ও মোহনার কাছাকাছি এলাকায় প্রস্থ প্রায় ৫০০ মিটার বা তার বেশি। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর পানি তীর উপচে প্লাবিত হলে নদীর বিস্তার আরও বেড়ে যায়। মাতামুহুরি নদীর গড় প্রস্থ শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৫ কিলোমিটারের মধ্যে ওঠানামা করে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও মাঠ তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত দুই-তিন দশকে নদীটির ভৌত ও পরিবেশগত চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় নদীর অনেক অংশে পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। যেখানে একসময় নৌ চলাচল ছিল নিয়মিত, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ বালুচর, খ-িত জলধারা ও ভাঙনপ্রবণ তীর।

চকরিয়ার সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও পরিবেশকর্মী বিএম হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘নদীটি এখন তার প্রাকৃতিক রূপে নেই। অনেক স্থানে এটি খালের মতো সরু হয়ে পড়েছে।’

স্থানীয় প্রবীণ জেলে বিধু জলদাসের ভাষায়, ‘এ নদী ছিল আমাদের জীবন। এখন মনে হয়, নদীটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।’

জানা গেছে, উজানের বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপকহারে বন উজাড় হওয়া, পাহাড় কাটা, নির্বিচার জুমচাষ এবং ভূমিক্ষয়ের ফলে বর্ষার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি, বালু ও পাথর নদীতে নামছে। পলির কারণে নদীতে তৈরি হচ্ছে চর, এতে নদীর গভীরতা ও প্রস্থ কমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে গড়ে ওঠা অসংখ্য কৃত্রিম বাঁধ ও মাছের ঘেরের নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। এতে পলি জমার হার আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং নদীর স্বপরিশোধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে এসব বাঁধ নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনিক নজরদারি থেকেও নেই। জানা গেছে, চকরিয়া অংশে প্রবাহিত মাতামুহুরি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলার অন্তত ২০টিরও বেশি স্থানে নিয়মিতভাবে ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম ফাঁসিয়াখালী, কাকারা, বরইতলী, কোনাখালী, বদরখালী, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের নদীসংলগ্ন বিভিন্ন অংশে বেশি দৃশ্যমান।

স্থানীয় জেলে, কৃষক ও বাসিন্দারা জানান, শুষ্ক মৌসুমে বালু উত্তোলন বেপরোয়া আকার ধারণ করে। নদীর মাঝখান ও তীরঘেঁষা এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে গভীর গর্ত তৈরি করা হচ্ছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে এবং তলদেশে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করা হয়, তবে দিনের বেলাতেও এ কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনিক নজরদারির সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে এ অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী হচ্ছে না। ফলে কিছু দিন বন্ধ থাকার পর আবারও একই স্থানে বালু তোলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে গভীর খাদ সৃষ্টি হচ্ছে, যা পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথকে পরিবর্তন করছে এবং তীরভাঙনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নদীর নাব্যতা হ্রাসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মৎস্য সম্পদে। একসময় নদীর গভীর ‘কুম’ বা জলাশয়গুলো ছিল দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। এখন অধিকাংশ কুম পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রজননের উপযোগী পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মাছের বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চকরিয়া জেলে সমিতির সদস্যদের মতে, গত ১৫ থেকে ২০ বছরে নদীতে দেশীয় মাছের উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। জেলে মোহাম্মদ বাহাদুর জানান, ‘আগে নদীতে নামলেই মাছ পাওয়া যেত, এখন দিন-রাত পরিশ্রম করেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।’

মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় নদীনির্ভর হাজারো জেলে-পরিবার এখন চরম আর্থিক সংকটে। অনেকে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, কেউ কেউ দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। ঋণের চাপ ও অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

অন্যদিকে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে উজানের পানি স্বাভাবিকভাবে সাগরে নামতে পারছে না। ফলে আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, প্লাবন ও ভাঙন। গ্রামীণ সড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা। অনেক এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচব্যবস্থা বিঘিœত হচ্ছে, ফসল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, নদীর জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং অপরিহার্য। শুধু ড্রেজিং যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, নদী দখলমুক্ত করা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা, উজানের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো বলেন, ‘মাতামুহুরি শুধু একটি জলধারা নয়, এটি একটি জীবনব্যবস্থা। নদীটি ধ্বংসের পথে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ নদীকে পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।’ তিনি ঢেঁমুশিয়া জলমহালের সøুইসগেট অপসারণসহ উজানের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কক্সবাজার কার্যালয়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দীন আহমদ বলেন, ‘উজান থেকে আসা পলি ও কৃত্রিম বাঁধের কারণে নদীতে নাব্যতা সংকট তীব্র হয়েছে। জাপানের অর্থায়নে নদীটির ওপর একটি গবেষণা চলছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। এরপর ড্রেজিংয়ের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।’

চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপায়ন দেব বলেন, ‘নদীর অবৈধ দখল, বাঁধ ও ঘেরের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মাতামুহুরি নদীর সংকট শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি পুরো অঞ্চলের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বিদেশ সফর শেষে ফিরলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা গেলে নদী তার নাব্যতা ফিরে পাবে এবং বন্ধ হবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন।’