পাল্টাপাল্টি হুমকি-ধমকির মধ্যেই পারস্য উপসাগর এলাকায় যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে আজ সোমবার এ আলোচনা শুরু হতে পারে। এই বৈঠকের জন্য ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ রওনা হচ্ছে, গতকাল সোমবার এমনটি জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল নিজের মালিকানাধীন সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে একথা জানিয়ে তেহরানকে দ্রুত চুক্তির শর্তগুলো মেনে নিতে কড়া হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ট্রাম্প গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার প্রতিনিধিরা (গতকাল) সন্ধ্যার মধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার প্রতিনিধিদলে থাকছেন। তবে ইসলামাবাদে গত ১১ ও ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে এবার পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন।
এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার না যাওয়ার কারণ হিসেবে ট্রাম্প বলেন, তিনি (ভ্যান্স) অত্যন্ত দক্ষ একজন মানুষ। শুধু নিরাপত্তার কারণেই তিনি এই সফরে যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে ইরানকে হুমকি দিতেও ছাড়েননি ট্রাম্প। আলোচনা ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি অত্যন্ত ন্যায্য এবং যুক্তিসঙ্গত চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছি। আমি আশা করি, তারা এটি গ্রহণ করবে। যদি তারা তা না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং প্রতিটি সেতু ধ্বংস করে দেবে।’
ইরানকে আর কোনো উদারতা দেখানো হবে না, এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘যদি তারা চুক্তি না মানে, তবে গত ৪৭ বছর ধরে যা করা উচিত ছিল, তা করা আমার জন্য সম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে; আমাদের তা করার সময় এসেছে।’
এর আগে, গত শনিবার হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয় পর্যালোচনার জন্য হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে জরুরি বৈঠক করেন ট্রাম্প। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সসহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন।
অবশ্য নিজেদের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর থাকা অবস্থায় ইরান দেশটির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসবে কি না, সে বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুটা সংশয় ছিল।
তেহরানভিত্তিক আধাসরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ বজায় থাকা অবস্থায় আলোচনার জন্য পাকিস্তানে কোনো প্রতিনিধিদল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। প্রতিবেদনে ইরানের এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, অবরোধ বহাল রেখে আলোচনার টেবিলে বসার কোনো পরিকল্পনা দেশটির সরকারের নেই।
অবশ্য চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, এমনটি মনে করেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তবে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়ে গেছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের আলোচক দল এখন একে অপরের সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ধারণা অর্জন করতে পেরেছে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রধান বিরোধগুলো রয়েই গেছে। এসব বিষয়ের খুঁটিনাটি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ।
তবে গালিবাফ বলেছেন, তার দেশ দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে মৌলিক বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রেও প্রতি অবিশ্বাসের জায়গাটি। আমাদের সৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চাই, এমন শান্তি যা যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধ করবে।’
অন্যদিকে, আলজাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই থাকবে, এমনটি স্পষ্টভাবে দাবি করছে। এক বিবৃতিতে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক সংস্থা আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে নোঙর করা কোনো ধরনের জাহাজই যেন নিজের জায়গা থেকে না সরে। হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়াকে শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কোনো জাহাজ এই নির্দেশ অমান্য করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’
দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং স্থল, আকাশ ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান আমির হাতামি। তিনি বলেছেন, শত্রুর মোকাবিলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করবে।
এদিকে, চলমান এই সংকটের মধ্যেই আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি।
রাজধানী সানায় হুতি সরকারের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসেইন আল আজ্জি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শান্তি বিঘ্নিত করতে থাকলে হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের পদক্ষেপ নিতে পারে। এক্সে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা আবার খোলার ক্ষেত্রে কোনো শক্তিই কাজে আসবে না।
লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণই বেশি।