প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ আমরা এক এক করে বাস্তবায়ন করব, ইনশা আল্লাহ। গতকাল সোমবার বিকেলে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।
বিকেল পৌনে ৫টায় মঞ্চে এসে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাজারো সমর্থক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। জেলা বিএনপির আয়োজনে এ জনসভার আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জনতার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রীর নিজ এলাকায় আগমন উপলক্ষে মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ (সোমবার) এই হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মিডিয়ার সামনে পরিষ্কারভাবে আমি আবারও বলে দিতে চাই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে জুলাই সনদে সই করে এসেছে, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ আমরা এক এক করে বাস্তবায়ন করব ইনশা আল্লাহ। কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এ কথা বলে দেওয়ার পরেও আমরা দেখলাম যে কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের হারিয়ে যাওয়া ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাদের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা এক যুগের বেশি সময় ধরে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
জনসভা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। জেলা বিএনপির আয়োজনে সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা। সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেখেছি দেশে কীভাবে উন্নয়নের কথা বলে, মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি করা হয়েছে। এ দেশের লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। জনগণ আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। নির্বাচনে আমরা জয়ী হয়ে দেশ পরিচালনা করছি এটি আমাদের দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ গাবতলীতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। আমরা কথা দিয়েছিলাম, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের প্রান্তিক আয়ের মানুষের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেব। বিএনপি কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছিল, আমরা কৃষকদের মাঝে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করেছি। আমরা বলেছিলাম, কৃষকদের ঋণ মওকুফ করব। আমরা কৃষকদের সুদসহ ঋণ মওকুফ করেছি। বিএনপি সরকার সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান এই বগুড়ার সন্তান। তিনি খাল খনন শুরু করেছিলেন কৃষি উন্নয়নের জন্য। আমরা খাল খনন শুরু করেছি। সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি হবে। দেশ এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, দেশের সর্বত্র আমরা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেছি। সারা দেশে সবুজায়নে কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ অন্ধকারের শাসন থেকে মুক্তি পায়। বর্তমান সরকার দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, যাতে অল্প খরচে বিদেশে কর্মসংস্থান করা যায়। সেই সঙ্গে দেশের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা যায়।
তারেক রহমান বলেন, জনগণ ম্যানডেট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে। সেই ম্যানডেট বিএনপি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করবে। জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। জনগণের কল্যাণে সব ম্যানডেট বাস্তবায়ন করা হবে। খুব দ্রুত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে বগুড়া সার্কিট হাউসে সস্ত্রীক পৌঁছান তারেক রহমান। এ সময় তার সঙ্গে প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বেলা ১১টা ৯ মিনিটে সার্কিট হাউস থেকে পায়ে হেঁটে জজকোর্ট চত্বরে উপস্থিত হয়ে নবনির্মিত আইনজীবী সমিতির ভবন উদ্বোধন করেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টায় জজ আদালতে ই-বেইলবন্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। দুপুর ১২টার দিকে নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে শহর থেকে গাবতলীর বাগবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হোন।
১৯ বছর পর পৈতৃক ভিটায় তারেক রহমান : প্রায় দুই দশক পর গতকাল পৈতৃক ভিটা বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়ীর ‘জিয়াবাড়ি’তে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর ‘জিয়াবাড়ি’তে গিয়েছিলেন তারেক রহমান।
গতকাল বিকেল ৪টায় বাগবাড়ীতে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘জিয়াবাড়ি’তে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী বাগবাড়ীর জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এরপর শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ৯১১ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন। এ ছাড়া বাগবাড়ীর নশিপুরে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চৌকিদহ খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজকে সরকারিকরণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের অনুষ্ঠানে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে উপস্থিত এলাকাবাসীর সঙ্গে রসিকতা করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যের এক পর্যায়ে থেমে যান তিনি। এ সময় গ্রামবাসী তাকে আরও দুই ঘণ্টা বক্তব্য দিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী তখন রসিকতা করে বলেন, ‘আরে খিদা পাইছে আমার। বাপের বাড়িতে খেতে দিবেন না? নামাজ বাকি, খাওয়া বাকি, খাল কাটা বাকি, জনসভা বাকি। আবার ঢাকায় যেতে হবে। আসব আবার, কথা বলব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘দুই যুগ পর এই কলেজ মাঠে আজ (সোমবার) আসতে পেরেছি। ১০ বছর ধরে এই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। আজ নিজের গ্রামে এসে মা-বোনদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে পেরেছি।’
কয়েকজন বক্তা বাগবাড়ীকে উপজেলা ঘোষণার দাবি জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই এলাকা শহীদ জিয়ার জন্মস্থান। আপনাদের যেমন শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ওপর হক আছে, সারা দেশের মানুষেরও হক আছে। শুধু গাবতলী বা বাগবাড়ীতে উন্নয়ন করলে হবে? সারা দেশই উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। আমি তো আছিই আপনাদের কাছে, এলাকার উন্নয়ন হবে। কিন্তু সারা দেশের প্রতি নজর দিতে হবে।’
নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশন উদ্বোধন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল দুপুর ১২টার দিকে নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন করেন। পরে সিটি করপোরেশন প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ করেন তিনি।
সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী বগুড়াবাসীর উদ্দেশে বলেন, আজ বগুড়া শহর আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করল। আজ বগুড়াবাসীর খুশির দিন। এই শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নিজের ঘর নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বগুড়া শহরকে মডেল টাউন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল এটি সিটি করপোরেশন হবে। সিটি করপোরেশনের যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকে, সে কাজগুলো ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত করার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের জনসভা শেষে সন্ধ্যায় বগুড়া প্রেসক্লাবের নতুন ভবন এবং বায়তুর রহমান কেন্দ্রীয় মসজিদের পুনর্নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।