পরিবেশদূষণ এবং আমাদের দায়

দিন দিন পরিবেশদূষণ বাড়ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। নদী স্বচ্ছতা হারাচ্ছে। বন উজাড় হচ্ছে। ফলে প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করছে। এগুলো মানুষের কর্মফল। মানুষের কর্ম আর প্রকৃতির প্রতিক্রিয়ার এই সম্পর্ক এখন আর অদৃশ্য নয়, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চারপাশের পরিবর্তনে। তাই সময় এসেছে থামার, ভাবার এবং নিজের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করার, যাতে ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে আসা যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে জলে-স্থলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, এতে তিনি তাদের তাদের কোনো কোনো কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা (অসৎ পথ হতে) ফিরে আসে।’ (সুরা রুম ৪১) প্রায় পনেরোশ বছর আগে অবতীর্ণ এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ যেন আজকের পৃথিবীর দিকে সরাসরি অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। পৃথিবী আজ দাবানলের শিখায় জ¦লছে। উত্তরে বরফ গলে সমুদ্রের বুকে মিলছে, দক্ষিণে মরুভূমির প্রসার ঘটছে আর মধ্যভাগের সবুজ বনাঞ্চল আগুনে ভস্মীভূত হচ্ছে। এগুলোকে নিছক পরিবেশগত সমস্যা বলা ঠিক হবে না, বরং এগুলো মানবসভ্যতার দায়িত্বহীনতার নগ্ন প্রকাশ এবং আমাদের অস্তিত্বের ওপর ঝুলে থাকা এক মারাত্মক হুমকি।

গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলনের চিত্র এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ। একাধিক স্যাটেলাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৬৪ থেকে ২৭০ বিলিয়ন টন বরফ হারাচ্ছে। এই বিশাল পরিমাণ বরফগলা জল সমুদ্রে মিশে প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ০.৮ মিলিমিটার বাড়াচ্ছে। ১৯৯৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডে একবারের জন্যও বরফের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি। প্রতি বছরই সেখানে বরফ হারানোর ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হওয়া মানে মানচিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় কোটি কোটি মানুষের বাসস্থান, জীবিকা ও সংস্কৃতির বিলুপ্তি। বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপ দেশের জন্য এই সংকট আরও তীব্র, কারণ এখানে সমুদ্র ও নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন অবিচ্ছিন্নভাবে বাঁধা।

কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর স্মরণ করো, যখন মুসা তার কওমের জন্য পানি চাইল, তখন আমি বললাম, তুমি তোমার লাঠি দ্বারা পাথরকে আঘাত করো। ফলে তা থেকে উৎসারিত হলো বারোটি ঝর্ণা। প্রতিটি দল তাদের পানি পানের স্থান জেনে নিল। তোমরা আল্লাহর রিজিক থেকে পানাহার করো এবং ফ্যাসাদকারী হয়ে জমিনে ঘুরে বেড়িও না।’ (সুরা বাকারা ৬০) কিন্তু মানুষ সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে পৃথিবীতে যে অনাচার করেছে, জলবায়ু সংকট তারই প্রতিফল। বিজ্ঞান বলছে, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং এই উষ্ণায়নের ফলে বনাঞ্চল ক্রমে শুষ্ক হয়ে দাবানলের উপযুক্ত জ্বালানিতে পরিণত হচ্ছে। গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ হচ্ছে, শীতকাল সংকুচিত হচ্ছে, বৃষ্টিপাতের চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে এবং এ সমস্ত পরিবর্তন একত্রে দাবানলকে আরও ভয়াবহ ও ঘন ঘন ঘটনায় পরিণত করছে।

কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘জমিনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী এবং দুই ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি তোমাদের মতো এক একটি জাতি। আমি কিতাবে কোনো ত্রুটি করিনি। অতঃপর তাদের তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।’ (সুরা আনআম ৩৮) এই আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে, প্রতিটি প্রাণী এই পৃথিবীতে মানুষের মতোই একটি পূর্ণাঙ্গ সম্প্রদায়, তাদের অস্তিত্বের নিজস্ব মূল্য ও অধিকার আছে। মানুষের হাতে তাদের আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া তাই সরাসরি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি অবিচার। সুরা হাজ্জের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, বৃক্ষও আল্লাহকে সিজদা করে, তার তাসবিহ পড়ে। তাহলে যে মানুষ সেই বৃক্ষকে অকারণে ধ্বংস করছে, সে যেন আল্লাহর তাসবিহ পাঠকারী সত্তাকেই মুছে দিচ্ছে। এই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে বন সংরক্ষণকে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচর্যায় পরিবেশ রক্ষার অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা হতে মানুষ, পাখি বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তবে তা তার পক্ষ হতে সদকা বলে গণ্য হবে।’  অপর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগ মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তাহলে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ)

২০২১ সালের অক্টোবরে ভারতের কেরালায় অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসে কমপক্ষে ২৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কমপক্ষে পাঁচ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কেরালার সব জেলা এই দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছিল। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের দাবি, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বন উজাড় ও পাহাড় কাটা এই বন্যার তীব্রতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। যে বন একসময় মাটিকে ধরে রাখত, বৃষ্টির পানিকে ধীরে ধীরে ভূগর্ভে প্রবেশ করাত এবং নদীর স্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করত, সেই বন ধ্বংস হওয়ায় পানি সরাসরি পাহাড় থেকে নেমে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু সংকটের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। হালদা নদী পৃথিবীর বিরল কয়েকটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননস্থলের একটি, যেখানে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় মাছ প্রাকৃতিকভাবে ডিম পাড়ে। কিন্তু নদীর উপকূলে বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত শিল্প স্থাপন ও জলদূষণের কারণে এই অনন্য বাস্তুতন্ত্র আজ হুমকির মুখে। কৃষক ও মৎস্যজীবী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সুন্দরবনের ওপরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে তীব্রভাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের বহু অংশ লবণাক্ততার শিকার হচ্ছে, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বাড়ছে এবং বনের জীববৈচিত্র্য সংকটে পড়ছে।

কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীর খলিফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে যা প্রদান করেছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। নিশ্চয় তোমার রব দ্রুত শাস্তিদানকারী এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আনআম ১৬৫) খলিফা মানে প্রতিনিধি। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে এসেছে এই পৃথিবীকে আবাদ করতে, ধ্বংস করবার জন্য আসেনি। ইসলামে পরিবেশ রক্ষা ফরজে কেফায়া অর্থাৎ সমাজের সামষ্টিক দায়িত্ব। ইসলামে ‘হিমা’ ব্যবস্থার কথা জানা যায়, যেখানে মদিনার দক্ষিণে একটি বিস্তৃত এলাকায় শিকার ও বৃক্ষনিধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রথম সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরির নজির।

মানুষের আচরণ ও মানসিকতার সংকটই পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় কারণ। তথ্যের অভাব সচেতনতার একটি অংশ মাত্র, প্রকৃত সমস্যা লুকিয়ে আছে মানুষের অভ্যাস, লোভ ও দায়িত্বহীনতায়। সরকার বা এনজিও যে পদক্ষেপই নিক না কেন, যদি স্থানীয় মানুষ তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ না নেয়, বন রক্ষার নিয়মকানুন মেনে না চলে, তাহলে কোনো নীতিমালাই কার্যকর হবে না। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষের জন্য সামনে ও পেছনে রয়েছে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী, যারা আল্লাহর নির্দেশে তাকে হেফাজত করে। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আর যখন আল্লাহ কোনো জাতির মন্দ চান, তখন তা প্রতিহত করা যায় না এবং তাদের জন্য তিনি ছাড়া কোনো অভিভাবক নেই।’ (সুরা রাদ ১১) এই আয়াতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হলো, পরিবর্তনের শুরু হতে হবে নিজের ভেতর থেকে, প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড থেকে।

ব্যক্তি পর্যায়ে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতিটি মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় না করা, খাদ্যের অপচয় রোধ করা, গাছ লাগানো এবং আগুনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, এই সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় সামষ্টিক পরিবর্তন।

বন, জলাশয়, প্রাণী ও মানুষের জীবন এক অপরিহার্য চক্রে আবদ্ধ। আমরা যদি আজ সতর্ক হই, সঠিক সিদ্ধান্ত নিই, বন পুনঃস্থাপন করি এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে সযতেœ ব্যবহার করি, তাহলে এই বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকেই সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, হাজী মুবেশ্বর আলী এলপি স্কুল, আসাম, ভারত