দীর্ঘদিন বাংলার মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে ছিল। তাদের কথা বলার মতো শক্তিশালী কোনো মাধ্যম ছিল না। সংবাদপত্রের জগতে তাদের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার অঙ্গনে আবির্ভূত হন মাওলানা আকরম খাঁ। মুসলিম সাংবাদিকতার বিকাশে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য পথিকৃৎ।
১৮৬৮ সালের ৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট মহকুমার হাকিমপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে তিনি সক্রিয়তা হন। সে সময় বাংলার মুসলমানরা নানা দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। ব্রিটিশ শাসনের শোষণ ছিল একদিকে। অন্যদিকে ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য। সংবাদপত্রের একটি বড় অংশও মুসলিম স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না।
এই বাস্তবতা মাওলানা আকরম খাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, মুসলমানদের জাগরণে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মুসলমানদের অধিকার, শিক্ষা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সামাজিক সমস্যাগুলো তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন নিজস্ব গণমাধ্যম। একই সঙ্গে ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরাও জরুরি। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সংবাদপত্র প্রকাশের কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯০৩ সালের ১৮ আগস্ট কলকাতা থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মাসিক ‘মোহাম্মদী’। এটিই ছিল তার সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা। পরে এটি পাক্ষিক এবং ১৯০৮ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’ দ্রুত বাংলাভাষী মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মুসলমানদের জাগরণমূলক লেখা ও সংবাদ এতে গুরুত্ব পেত। বাংলা, আসাম ও বার্মার মুসলমানদের মধ্যে পত্রিকাটির ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়।
সে সময় মুসলমানদের অভাব, অভিযোগ ও অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল সীমিত। ‘মোহাম্মদী’ সেই জায়গাটি পূরণ করে। মফস্বলের বহু এলাকাতেও এর প্রচার পৌঁছে যায়। যদিও কয়েক বছর পর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
১৯১৩ সালে ‘আঞ্জুমানে ওলামা’ নামে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গঠিত হলে আকরম খাঁ এর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এ প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় মাসিক ‘আল এসলাম’। তিনি এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘আল এসলাম’ তার সাংবাদিকতার ধারাকে আরও এগিয়ে নেয়।
এরপর আসে তার সাংবাদিক জীবনের আরও সংগ্রামী অধ্যায়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি প্রকাশ করেন ‘সেবক’ পত্রিকা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে পত্রিকাটির অবস্থান ছিল স্পষ্ট। অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে ‘অগ্রসর! অগ্রসর!’ শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পত্রিকার জামানত তলব করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রকাশনা। বিচারের নামে প্রহসনে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯২৩ সালের ১৪ মে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় উর্দু দৈনিক ‘জামানা’। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে পত্রিকাটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কারামুক্তির পর ‘মোহাম্মদী’-কে দৈনিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তা বেশি দিন টেকেনি। ১৯২৭ সালের ৬ নভেম্বর আকরম খাঁ দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার প্রকাশ করেন মাসিক ‘মোহাম্মদী’। এবার পত্রিকাটি হয়ে ওঠে মুসলিম লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ইসলামি নবজাগরণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়েও এতে লেখা প্রকাশিত হতো।
মাওলানা আকরম খাঁর সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি দৈনিক ‘আজাদ’। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর কলকাতা থেকে তার সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ‘আজাদ’ বাংলার মুসলমানদের অন্যতম প্রধান দৈনিক মুখপত্রে পরিণত হয়। মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার, শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রশ্নে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশেও এর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট মসজিদে ইবাদতরত অবস্থায় তার ইন্তেকাল হয়। দীর্ঘ জীবনের সংগ্রাম শেষে তিনি রেখে যান সাংবাদিকতার এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। তার হাতেই মুসলিম সাংবাদিকতা পেয়েছিল সংগঠিত রূপ।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক