চিরসুখের আবাস জান্নাত। মহান আল্লাহ মুমিন বান্দাদের জন্য এই আবাস তৈরি করেছেন। তিনি জান্নাতকে এমন সৌন্দর্য দিয়ে সাজিয়েছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি এবং কোনো হৃদয় কল্পনা করতে পারেনি। জান্নাতের জগৎ এমনই অপরূপ। কোরআনের বহু জায়গায় জান্নাতের কথা এসেছে। কখনো এর নদীর কথা বলা হয়েছে। কখনো ফলভরা বাগান, কখনো পোশাক, অলংকার ও প্রাসাদের কথা বলা হয়েছে। আবার কখনো এমন জীবনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে নেই ভয়, কোলাহল ও ক্লান্তি।
কোরআনের বর্ণনায় জান্নাতের প্রথম যে দৃশ্যটি আমাদের সামনে আসে, তা হলো সবুজ বাগান ও প্রবহমান নদী। জান্নাতের তলদেশে রয়েছে প্রবহমান নদী। সেই নদীর পানি নির্মল। এছাড়া রয়েছে দুধ ও মধুর নদী, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তিত হবে না। জান্নাতের নদীগুলো যেন তার সৌন্দর্য ও প্রাচুর্যের অনন্য পরিচয়। জান্নাতে রয়েছে অসংখ্য ঝরনা। সেসব ঝরনার বর্ণনা জান্নাতের নেয়ামতের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
জান্নাতের বাগান ফলে ভরপুর। মানুষ নিজের পছন্দমতো ফল পাবে। কোনো ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। কোনো মৌসুমের ওপর নির্ভর করতে হবে না। গাছের ফল থাকবে হাতের নাগালের মধ্যে।
কোরআনে খেজুর ও ডালিমের কথা বিশেষভাবে এসেছে। এসেছে আঙুরের বাগানের কথা। এসেছে কাঁটাবিহীন বরই গাছের কথা। এসব গাছের সৌন্দর্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ফলের প্রাচুর্য।
দুনিয়ায় একটি ফল পেতে অনেক কিছু করতে হয়। কখনো চাষ করতে হয়। কখনো বাজারে যেতে হয়। কখনো মৌসুমের অপেক্ষা করতে হয়। জান্নাতে এমন নিয়ম নেই। সেখানে ফল সহজলভ্য। প্রয়োজনের মুহূর্তেই তা পাওয়া যাবে।
জান্নাতের খাবারের মধ্যেও রয়েছে অপার বৈচিত্র্য। কোরআনে পাখির মাংসের কথা এসেছে। জান্নাতবাসী যে ধরনের পাখির মাংস চাইবে, তা তাদের জন্য থাকবে। তাদের পছন্দ অপূর্ণ থাকবে না।
পানীয়ের ক্ষেত্রেও থাকবে অনন্য আয়োজন। জান্নাতে থাকবে পবিত্র শরাব বা পানীয়, যা পান করলে মাথাব্যথা হবে না, মানুষ মাতালও হবে না। এসব পানীয় পরিবেশনের জন্য থাকবে বিশেষ পাত্র। কোরআনে রূপার পাত্রের কথা এসেছে। এসেছে কাচের মতো স্বচ্ছ পাত্রের কথা। আবার সোনার থালা ও পানপাত্রের কথাও এসেছে।
জান্নাতের প্রকৃতি প্রশান্তিময়। সেখানে রয়েছে বিস্তৃত ছায়া, ঘন সবুজ বাগান, শীতল পরিবেশ। সেখানে সূর্যের তীব্র তাপ মানুষকে কষ্ট দেবে না। প্রচণ্ড শীতও থাকবে না। থাকবে না ক্লান্তি ও অবসাদ।
জান্নাতের বসবাসের স্থান অত্যন্ত সুন্দর। সেখানে থাকবে উঁচু ও সুসজ্জিত আসন। থাকবে মুখোমুখি বসার ব্যবস্থা। থাকবে বিছানা, গদি, কুশন ও সুন্দর কার্পেট। থাকবে আরামদায়ক শয্যা। সবকিছুতেই থাকবে সৌন্দর্য ও মর্যাদার ছাপ।
জান্নাতের পোশাক দুনিয়ার পোশাকের মতো সাধারণ হবে না। মুমিনরা সেখানে রেশমের পোশাক পরবে। থাকবে সবুজ রেশম। পোশাকের সঙ্গে থাকবে নানা ধরনের অলংকার। সোনার কঙ্কণ থাকবে। রুপার কঙ্কণ থাকবে। থাকবে মুক্তার অলংকার। এসব অলংকার জান্নাতবাসীদের সৌন্দর্য বাড়াবে। একই সঙ্গে তাদের সম্মান ও মর্যাদারও প্রকাশ ঘটাবে।
জান্নাতে থাকবে পবিত্র জীবনসঙ্গী। তাদের সৌন্দর্য ও পবিত্রতার বিভিন্ন দিক কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। জান্নাতের এই সম্পর্ক হবে সম্পূর্ণ শান্তিময়। সেখানে থাকবে না কোনো অশান্তি। থাকবে না বিচ্ছেদের ভয়। থাকবে না সম্পর্কের কষ্ট।
জান্নাতবাসীদের সেবায় থাকবে চিরকিশোররা। তারা তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াবে। কোরআনে তাদের সৌন্দর্যকে ছড়িয়ে থাকা মুক্তার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
দুনিয়ায় মানুষ যত কিছুই অর্জন করুক, তার জীবনে ভয়, দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থাকে। প্রিয়জন হারানোর আশঙ্কা থাকে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে। জান্নাতে এসবের কিছুই থাকবে না। সেখানে থাকবে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি। থাকবে না কোনো অর্থহীন কথা। মহান আল্লাহ জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে দুঃখ দূর করে দেবেন। তাদের মনে কোনো কষ্ট থাকবে না। তারা সম্পূর্ণ প্রশান্তিতে বসবাস করবে।
জান্নাতের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি হলো, সেখানে মানুষের আকাক্সক্ষা অপূর্ণ থাকবে না। মানুষ যা চাইবে, তা পাবে। তার অন্তর যা কামনা করবে, তা তার সামনে উপস্থিত হবে। তার চোখ যা দেখে আনন্দিত হবে, তাও সেখানে থাকবে।
এখানেই জান্নাতের সঙ্গে দুনিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। দুনিয়ায় মানুষ অনেক কিছু চায়। কিন্তু সবকিছু পায় না। আবার অনেক কিছু পায়। কিন্তু ধরে রাখতে পারে না। অনেক আনন্দ আসে। আবার চলে যায়। জান্নাতে আনন্দ আসবে, কিন্তু চলে যাবে না। সুখ থাকবে, কিন্তু তার অবসান হবে না।
জান্নাতের জীবন হবে চিরস্থায়ী। সেখানে মৃত্যু নেই। বার্ধক্য নেই। দুর্বলতা নেই। অসুস্থতা নেই। বিচ্ছেদ নেই। জীবনের আনন্দের কোনো সমাপ্তিও নেই।
জান্নাতের এসব নেয়ামতের চেয়েও বড় হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। কারণ জান্নাতের সব সৌন্দর্যের চূড়ান্ত মূল্য তখনই পূর্ণ হবে, যখন মানুষ তার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভ করবে। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এখানে আনন্দের সঙ্গে কষ্ট মিশে থাকে। প্রাপ্তির সঙ্গে হারানোর ভয় থাকে। কিন্তু জান্নাতে থাকবে শুধু প্রাপ্তি। থাকবে না হারানোর ভয়।
সেখানকার নদী শুকাবে না। ফল শেষ হবে না। রিজিক কমবে না। সৌন্দর্য মøান হবে না। আনন্দ নিঃশেষ হবে না।
কোরআনে জান্নাতের বর্ণনা মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানায়। দুনিয়ার সাময়িক মোহ পেরিয়ে চিরস্থায়ী জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মুমিনকে সৎকর্মে উৎসাহিত করে। আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকতে শেখায়। জান্নাতের প্রতিটি বর্ণনাই একেকটি আশার বার্তা এবং চিরস্থায়ী জীবনের আহ্বান। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাত লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র : সুরা বাকারা ২৫, সুরা আলে ইমরান ১৩৩, ১৩৬, সুরা নিসা ৫৭, সুরা কাহাফ ৩১, সুরা মারইয়াম ৬২, সুরা হজ ২৩, সুরা ওয়াকিয়া ১৫-৪০, সুরা নাবা ৩১-৩৬