ক্লান্ত শিক্ষার্থী উদ্বিগ্ন পরিবার

ভোরের শহর এখন শুধু অফিসগামী মানুষের নয়। অনেক এলাকায় সকাল ৬টার আগেই দেখা যায় স্কুলব্যাগ কাঁধে শিশুরা রিকশা, সিএনজি বা মোটরসাইকেলে চড়ে কোথাও যাচ্ছে। গন্তব্য স্কুল নয়, কোচিং সেন্টার। আবার বিকেল নামলেই, একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। স্কুল শেষ, খাবার শেষ না হতেই আরেক দৌড়। গণিত স্যার, ইংরেজি স্যার, বিজ্ঞান ব্যাচ, ভর্তি প্রস্তুতি, মডেল টেস্ট। শহরের অলিগলি, আবাসিক ভবনের নিচতলা, বাণিজ্যিক ভবনের সরু সিঁড়ি, মার্কেটের ওপরের কক্ষ অথবা কোনো বাসার কক্ষ, সব জায়গায় যেন শিক্ষার ভিন্ন ছায়া-ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আমরা তাকে বলি ‘কোচিং’। কিন্তু আসলে এটি শুধু কোচিং নয়, বরং তা শিক্ষার্থী, পরিবার এবং মূল শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির প্রকাশ। কোচিং সেন্টার কেন এত বড় হয়ে উঠল, প্রশ্নটি সহজ নয়। একদিকে আছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা, অন্যদিকে অভিভাবকের নিরাপত্তাহীনতা। একজন অভিভাবক ভাবেন, পাশের বাসার শিশুটি যদি তিনটি কোচিং করে, আমার সন্তান না করলে পিছিয়ে পড়বে না তো? এই ভয় বাজার তৈরি করে। আর সেই বাজার, ভয়কে আরও বড় করে তোলে। ভালো স্কুলে ভর্তি, ভালো কলেজে ভর্তি, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএস, চাকরি প্রতিটি ধাপে প্রতিযোগিতার চাপ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, শিশুরা ছোটবেলা থেকেই নিজের জীবনকে প্রস্তুতি-পর্ব হিসেবে দেখতে শেখে। জীবন নয়, প্রস্তুতি। আনন্দ নয়, সিলেবাস। শেখা নয়, নম্বর। এখানে শিক্ষার্থী সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী। সে সকালে স্কুলে যায়, দুপুরে ফিরে ব্যাগ বদলায়, বিকেলে কোচিং, রাতে হোমওয়ার্ক, সপ্তাহান্তে মডেল টেস্ট। তার খেলাধুলা কমে যায়, পড়ার আনন্দ কমে যায়, কৌতূহল কমে যায়। যাকে আমরা বলি মেধাবী ছাত্র, সে অনেক সময় আসলে ক্লান্ত ছাত্র। তার চোখে ঘুম নেই, হাতে সময় নেই, মনে অবকাশ নেই।

শিক্ষা মানুষের ভেতর প্রশ্ন জাগানোর কথা, তাকে শৃঙ্খলিত যন্ত্র বানানোর কথা নয়। একটি শিশু যদি সবসময় মূল্যায়নের ভয়ে থাকে, তবে সে সাহসী চিন্তা করতে শেখে না। সে কেবল সঠিক উত্তর খোঁজে, কিন্তু সঠিক প্রশ্ন করতে শেখে না। পরিবারের অবস্থাও খুব আলাদা নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে কোচিং খরচ এখন মাসিক বাজেটের বড় অংশ। স্কুল ফি, বই, খাতা, পরিবহন, ইউনিফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ফি, ব্যাচ ফি, স্পেশাল ক্লাস, মডেল টেস্ট, ভর্তি গাইড, প্রাইভেট টিউটর। অনেক পরিবার সামাজিক মর্যাদা রক্ষার মতো করেই, সন্তানের কোচিং তালিকা সাজায়। মা-বাবারাও ক্লান্ত। কেউ অফিস শেষে সন্তানকে আনতে যান, কেউ বাসায় বসে অনলাইন ক্লাসের লিংক মেলান, কেউ মাস শেষে হিসাব করেন কোন ব্যাচ রাখা যাবে, কোনটা বাদ দেওয়া যাবে। এক ধরনের পারিবারিক উদ্বেগ স্থায়ী হয়ে গেছে। সন্তান পড়ছে, তবু ভয়। কোচিং করছে, তবু ভয়। ভালো ফল করলেও ভয়, পরের ধাপে কী হবে? কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি, মূল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে। যদি স্কুলেই শেখানো যথেষ্ট হতো, তাহলে কোচিং সেন্টার এত অপরিহার্য হয়ে উঠল কেন? স্কুলে শিক্ষক আছেন, সিলেবাস আছে, পরীক্ষা আছে, ক্লাসরুম আছে। তবু কেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মনে করেন, আসল প্রস্তুতি বাইরে? এর মানে হলো, স্কুলের ওপর আস্থা কমেছে।

অনেক জায়গায় ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ কম, মূল্যায়ন পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর, দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা সহায়তা নেই। একই সঙ্গে মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য সৃজনশীল চ্যালেঞ্জও নেই। ফলে স্কুল হয়ে যাচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা আর কোচিং হয়ে উঠছে বাস্তব প্রস্তুতির কেন্দ্র। এটি কোনো সুস্থ লক্ষণ নয়। আরেকটি নীরব বৈষম্যও তৈরি হচ্ছে। যে পরিবার বেশি খরচ করতে পারে, সে সন্তানকে ভালো কোচিং, ভালো নোট, ভালো শিক্ষক, ছোট ব্যাচ এবং আলাদা মেন্টর দিতে পারে। যে পরিবার পারে না, সে সন্তান একই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। আমরা বাইরে থেকে বলি, পরীক্ষা সবার জন্য সমান। কিন্তু প্রস্তুতির সুযোগ কি সবার জন্য সমান? একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন তিন ঘণ্টা কোচিং, আলাদা টেস্ট সিরিজ এবং ব্যক্তিগত গাইডেন্স পায় অন্যদিকে আরেকজন যদি শুধু স্কুলের ক্লাসের ওপর নির্ভর করে, তাহলে তাদের প্রতিযোগিতা কাগজে সমান হলেও, বাস্তবে তা নয়। এতে মেধা নয়, অনেক সময় অর্থনৈতিক সামর্থ্যই ফল নির্ধারণ করে। কোচিং সেন্টারের আরেকটি দিক আমরা প্রায় এড়িয়ে যাই।  সেটি হলো নগর-নিরাপত্তা। অনেক কোচিং সেন্টার চলে ভাড়া করা ভবনের ছোট কক্ষে।  যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, দরজা কম, সিঁড়ি সরু, জরুরি নির্গমন পথ নেই, অগ্নিনিরাপত্তা দুর্বল, ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের কোনো মহড়া নেই। সন্ধ্যার ব্যাচে শত শত শিক্ষার্থী একটি ভবনে ওঠানামা করে। অভিভাবকের ভিড় রাস্তায় যানজট তৈরি করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে শিক্ষাসেবা দিলেও, তাদের নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমাদের নজরদারি খুব সীমিত। শিক্ষা শুধু সিলেবাসের বিষয় নয়; শিক্ষার্থীর নিরাপদ উপস্থিতিও এর অংশ। তাহলে সমাধান কী? প্রথম সমাধান কোচিং সেন্টার বন্ধের স্লোগান নয়। কারণ চাহিদা থাকলে বাজার অন্য নামে ফিরে আসবে। সমাধান হলো স্কুলকে শক্তিশালী করা।

বিদ্যালয়ের ভেতরেই রিমেডিয়াল ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা, দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য অতিরিক্ত সময়, মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য উন্নত সমস্যা সমাধান সেশন এবং নিয়মিত ফিডব্যাক চালু করতে হবে। শিক্ষককে শুধু সিলেবাস শেষ করার যন্ত্র বানালে হবে না; তাকে শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি বোঝার সময় দিতে হবে।  দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার ধরন বদলাতে হবে। যতদিন পরীক্ষায় মুখস্থ, শর্টকাট, সাজেশন, কমন প্রশ্ন এবং টেকনিকনির্ভর সাফল্য বেশি মূল্য পাবে, ততদিন কোচিং সংস্কৃতি কমবে না। মূল্যায়ন যদি হয় বিশ্লেষণ, প্রয়োগ, ভাষা, যুক্তি, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীলতার ওপর, তাহলে কোচিং বাজারের অনেক কৃত্রিমতা কমে যাবে। শিক্ষার্থী তখন শুধু উত্তর মুখস্থ করবে না, বিষয় বুঝতে বাধ্য হবে। তৃতীয়ত, কোচিং সেন্টারগুলোর নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নীতিমালা জরুরি। কোথায় কতজন শিক্ষার্থী বসবে, জরুরি নির্গমন পথ আছে কিনা, অগ্নিনিরাপত্তা আছে কিনা, শিক্ষকতার ন্যূনতম মানদণ্ড কী, ফি কাঠামো কতটা স্বচ্ছ, এসবের একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকতে হবে। বাজার যখন আছে, তাকে অস্বীকার না করে জবাবদিহির মধ্যে আনাই বাস্তবসম্মত পথ। চতুর্থত, পরিবারকেও ভাবতে হবে, সন্তানের সময় কি শুধু বিনিয়োগের বস্তু? প্রতিটি অতিরিক্ত ক্লাস কি সত্যিই দরকার? শিশুর বিশ্রাম, ঘুম, খেলা, বন্ধুত্ব, বই পড়া, সৃজনশীলতা এগুলোও শিক্ষার অংশ। যে শিশু সারাক্ষণ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, সে হয়তো পরীক্ষায় ভালো করবে, কিন্তু জীবন বোঝার সময় পাবে কি?

এখানেই বর্তমান শিক্ষা নেতৃত্বের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়। শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি শিক্ষার মানোন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছেন, আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও প্রাথমিক শিক্ষাকে আধুনিকায়ন, শিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার ওপর জোর দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতিগুলো তখনই অর্থবহ হবে, যখন কোচিং-নির্ভরতার মূল কারণগুলোতে হাত দেওয়া হবে। ড. মিলন ও ববি হাজ্জাজের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট : স্কুলকে আবার শেখার প্রধান জায়গা বানাতে হবে, শিক্ষককে শক্তিশালী করতে হবে, দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ের ভেতরেই সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। আর কোচিং সেন্টারগুলোকে মান, নিরাপত্তা ও ফি-স্বচ্ছতার জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। মানুষ আর শুধু নতুন স্লোগান শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় এমন পদক্ষেপ, যাতে সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে পরিবারকে ঋণ, উদ্বেগ ও অদৃশ্য প্রতিযোগিতার মধ্যে ডুবে থাকতে না হয়।  কোচিং সেন্টারের শহর আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আয়না। সেখানে শিক্ষার্থীর ক্লান্ত চোখ, অভিভাবকের উদ্বিগ্ন মুখ, স্কুলের প্রতি কমে যাওয়া আস্থা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক সমাজের কঠিন সত্য একসঙ্গে দেখা যায়। এই আয়না ভাঙলে সমস্যা যাবে না। দরকার আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দেখা। শিক্ষা যদি সত্যিই জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে শুধু কোচিংয়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড় করানো যায় না। স্কুলকে আবার শেখার কেন্দ্র করতে হবে। পরিবারকে আবার শ্বাস নেওয়ার জায়গা দিতে হবে এবং  শিক্ষার্থীকে আবার শিশু হতে দিতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফল নয়, শিক্ষা মানে সুস্থ মানুষ গড়ে তোলা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

tanvir.mustafy@northsouth.edu