জাহান্নামের স্তর ও বৈশিষ্ট্য

জাহান্নাম আরবি শব্দ। এটাকে ফারসিতে দোজখ আর বাংলায় নরক বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় জাহান্নাম হলো পরকালে পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট যন্ত্রণাদায়ক আবাসস্থল। সেদিন যাদের আমলনামার প্রতি আল্লাহতায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন তাদের শাস্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। মূলত জাহান্নাম একটি বিভীষিকাময় ও ভয়ংকর শাস্তির স্থান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে জাহান্নাম অত্যন্ত নিকৃষ্ট।’ (সুরা ফুরকান ৬৬)

জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরে রাখা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার শাস্তির ব্যবস্থা। অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ অনুপাতে সেসব স্তরে রেখে শাস্তি দেওয়া হবে। সবাইকে এক স্তরে রেখে এক মাত্রায় শাস্তি দেওয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে।’ (সুরা নিসা ১৪৫)

জাহান্নামের সাতটি স্তর রয়েছে। এই সাত স্তরে সাত শ্রেণির জাহান্নামি থাকবে। জাহান্নামের প্রথম স্তরের নাম ‘জাহান্নাম’। এই স্তরে থাকবে গুনাহগার মুমিনরা। জাহান্নামের দ্বিতীয় স্তরের নাম ‘লাজা’। এর অর্থ লেলিহান অগ্নি। লাজায় থাকবে ইহুদিরা। জাহান্নামের তৃতীয় স্তরের নাম ‘হুতামাহ’। এর অর্থ প্রজ¦লিত আগুন, যা হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এই স্তরে খ্রিস্টানরা অবস্থান করবে। চতুর্থ স্তরের নাম ‘সাঈর’। এর অর্থ জ¦লন্ত আগুন। জাহান্নামের এই স্তরে থাকবে সাবিনরা (ইহুদিদের একটি উপদল)। পঞ্চম স্তরের নাম ‘সাকার’। এর অর্থ যন্ত্রণাদায়ক আগুন। পঞ্চম স্তরে থাকবে অগ্নিপূজারীরা। ষষ্ঠ স্তরের নাম ‘জাহিম’। এর অর্থ কঠিন অগ্নিদাহ। এই স্তরে থাকবে মুশরিকরা। সপ্তম স্তরের নাম ‘হাবিয়াহ’। এর অর্থ গভীর গর্ত বা পাতাল। একে বলা হয় ভয়াবহ জাহান্নাম। এটিই জাহান্নামের সর্বনিম্ন ও সর্বনিকৃষ্ট স্তর। এই স্তরে থাকবে মুসলিম নামধারী মুনাফিকরা।

এ ছাড়া বিভিন্ন বর্ণনায় আরও কিছু জাহান্নামের নাম পাওয়া যায়। এক. দারুল বাওয়ার তথা ধ্বংসের ঘর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি কি তাদের দেখো না, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরি দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং তাদের কওমকে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে দিয়েছে? তারা জাহান্নামে দগ্ধ হবে, আর কতই না নিকৃষ্ট এই বাসস্থান।’ (সুরা ইবরাহিম ২৮-২৯) আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আয়াতে উল্লিখিত ‘দারুল বাওয়ার’ হলো জাহান্নাম। (তাফসিরে ইবনে কাসির) দুই. গাছছাক তথা হ্রদ। জাহান্নামিদের রক্ত, ঘাম ও পুঁজ প্রবাহিত হয়ে সেখানে জমা হবে। তিন. গিসলিন। জাহান্নামিদের শরীরের পচা দুর্গন্ধযুক্ত মাংস বা ফোড়া থেকে নির্গত পুঁজ ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিকে গিসলিন বলা হয়। জাহান্নামিরা যখন খুব ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করবে তখন গাছছাক ও গিসলিন থেকে তাদের পান করতে দেওয়া হবে।

চার, সউদ। তিনাতুল খাবালের পাড়ে অবস্থিত একটি বিশাল পাহাড়। এক শ্রেণির জাহান্নামিদের এই পাহাড়ের ওপর উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হবে, আবার উঠানো হবে এবং আবার ফেলে দেওয়া হবে, যা সরিা মুদ্দাসসিরে বর্ণিত হয়েছে। পাঁচ. জুববুল হুজন। এখানে অহংকারী লোকদের শাস্তি দেওয়া হবে। ছয়. গাই। জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। এর ভীতিজনক হুঙ্কার শোনার পর জাহান্নামের অন্যান্য স্থান প্রতিদিন ‘গাই’ থেকে ৪০০ বার আশ্রয় চায়। (জান্নাত-জাহান্নাম, শায়খ ড. ওমর সুলাইমান)

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক