ভ্রাতৃত্বে দৃঢ় হয় হৃদয়ের বন্ধন

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:১২ এএম

মহান আল্লাহ আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। এটি অনেক বড় নেয়ামত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজুরাত ১০) ভ্রাতৃত্ব এমন দৃঢ় বন্ধন, যা সবার হৃদয়কে একত্র করে। এটি সেই ভালোবাসা, যা আল্লাহ সুস্থ হৃদয়ের মধ্যে স্বভাবগতভাবে স্থাপন করেছেন। এই ভ্রাতৃত্বের সামনে অন্য সব সম্পর্ক মøান হয়ে যায়। এর সামনে অন্য সব বন্ধন সংকুচিত হয়ে আসে।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা কোরো না, একে অন্যের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, একে অন্যের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন কোরো না এবং তোমাদের কেউ যেন অন্যের বিক্রয়ের ওপর বিক্রয় না করে। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না এবং তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। তাকওয়া এখানে, এ কথা বলে তিনি তার বুকের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করলেন। কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে। একজন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান হারাম।’ (সহিহ মুসলিম ২৫৬৪)

মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সংহতি একটি জরুরি দায়িত্ব। এই সম্পর্কের ব্যাখ্যায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জন্য সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো। দেহের কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর অনিদ্রা ও জ্বরে তার সঙ্গে অংশগ্রহণ করে।’ (সহিহ বুখারি ৬০১১)

এভাবে তিনি মুসলিমদের একটি সত্তা, একটি দেহ এবং একটি ভবনের মতো অভিহিত করেছেন। সুতরাং তাদের পরস্পরের প্রতি দয়া করতে হবে, সহমর্মী হতে হবে, একে অন্যকে কল্যাণের পরামর্শ দিতে হবে এবং সত্যের পক্ষে একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হবে। তারা একে অন্যের জন্য এমন সব কল্যাণ কামনা করবে, যা তারা নিজেদের জন্য কামনা করে।

আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘আমি আমার সত্তরজন ভাইয়ের জন্য সেজদার মধ্যে দোয়া করি।’ একজন মুসলিম শুধু নিজের জন্য বাঁচবে না। বরং সব অবস্থায় সে তার মুসলিম ভাইয়ের পাশে থাকবে এবং বিপদাপদে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সব মুসলিম একজন ব্যক্তির মতো। তার চোখে ব্যথা হলে পুরো শরীর ব্যথা অনুভব করে। তার মাথায় ব্যথা হলে পুরো শরীর ব্যথা অনুভব করে। (সহিহ মুসলিম ২৫৮৬)

হে ভাইয়েরা! মুসলিমদের পারস্পরিক সংহতি কোনো ঐচ্ছিক বা অতিরিক্ত বিষয় নয়। বরং এটি ইমানি জীবনের অন্যতম ভিত্তি। এর মাধ্যমে নেয়ামত স্থায়ী হয় এবং বিপদাপদ দূর হয়। ইসলাম এসেছে বিচ্ছিন্ন হৃদয়গুলোকে একত্র করতে এবং পরস্পর দূরে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে।

এই কাক্সিক্ষত পারস্পরিক সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কয়েকটি দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অন্তরকে বিদ্বেষ, হিংসা ও শত্রুতা থেকে পবিত্র করা। মানুষের কাছ থেকে কষ্ট ও অনিষ্ট দূর করা। সত্যের পক্ষে একে অন্যকে সহযোগিতা করা। যেমন নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করা এবং জালেমকে তার জুলুম থেকে বিরত রাখা। মুসলিম ভাইদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া। তাদের অন্তরে আনন্দ সৃষ্টি করা। বিভিন্নভাবে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া ও সহযোগিতা করা। কোনো মুসলিম যদি তার কোনো ভাইয়ের মধ্যে দারিদ্র্য, অভাব বা প্রয়োজন দেখতে পায়, অথবা সে কোনো কঠিন সমস্যায় পড়ে কিংবা কোনো বিপদে আক্রান্ত হয়, তাহলে সে যেন তার বিপদ দেখে আনন্দিত না হয়। বরং তার প্রতি দয়া করবে। তার ওপর যে বিপদ এসেছে, তাতে নিজেও ব্যথিত হবে। তার দুঃখে কষ্ট অনুভব করবে। তার প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসবে এবং তার ওপর নেমে আসা বিপদকে যতটা সম্ভব হালকা করার চেষ্টা করবে।

হে ইমানদার ভাইয়েরা! আল্লাহর জন্য পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের অন্যতম দাবি হলো, উম্মাহর সদস্যরা পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়েদা ২)

মহান আল্লাহ দ্বীনি ও দুনিয়াবি কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কাজই সৎকর্ম ও তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত। কোনো কোনো মনীষী বলেছেন, ‘সৎকর্মে সহযোগিতা হলো ঐক্যের আহ্বান। মতের ঐক্য মানুষের কাক্সিক্ষত বিষয় অর্জনের পথ তৈরি করে এবং ভালোবাসা অর্জনের কারণ হয়।’

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, ‘দুনিয়াতে আদম সন্তানদের জীবন ও জীবিকা পরস্পরের সহযোগিতা ছাড়া পূর্ণ হতে পারে না।’

হে ভাইয়েরা! দ্বীনের বিষয়ে সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধের ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করা। একইভাবে মানুষকে কল্যাণকর জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া এবং আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রেও পরস্পরকে সহযোগিতা করা জরুরি।

এটি সহযোগিতার সর্বোত্তম ও সবচেয়ে ফলপ্রসূ ক্ষেত্রগুলোর একটি। কারণ এর মাধ্যমে অজ্ঞ ব্যক্তিকে শিক্ষা দেওয়া হয়। উদাসীন ব্যক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। পথভ্রষ্ট ব্যক্তিকে সঠিক পথ দেখানো হয়। সমাজকে সংশোধনের চেষ্টা করা হয়।

প্রত্যেক মুসলিম তার সামর্থ্য অনুযায়ী এই কাজে অংশ নেবে। কেউ তার জ্ঞান দিয়ে সহযোগিতা করবে। কেউ তার সম্পদ দিয়ে সহযোগিতা করবে। কেউ তার প্রভাব ও মর্যাদা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা করবে। আবার কেউ এই কল্যাণের দিকে মানুষকে পথ দেখিয়ে এবং মানুষকে এতে উৎসাহিত করে সহযোগিতা করবে।

এই কল্যাণকর কাজে সহযোগিতাকারীদের প্রতিদান কতই না মহান! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো হেদায়েতের দিকে আহ্বান করে, তার জন্য সেই হেদায়েত অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে। এতে তাদের সওয়াব থেকে সামান্যও কমানো হবে না। (সহিহ মুসলিম ২৬৭৪)

দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে বৈধ সহযোগিতার ক্ষেত্রও অনেক। এসব ক্ষেত্রে মানুষের পরস্পরের সহযোগিতার প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না। এর মধ্যে রয়েছে বিপদগ্রস্ত মানুষের বিপদ দূর করা এবং প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা। এসব কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষের একে অন্যের সহযোগিতা কতই না প্রয়োজন!

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব একটি দৃঢ় ইমানি বন্ধন। এই বন্ধন রক্তের সম্পর্ক, ভাষা, বর্ণ, বংশ কিংবা দেশের সীমারেখা অতিক্রম করে। এটি এমন এক ভিত্তি, যার ওপর সুদৃঢ় মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো। তোমরা যখন পরস্পরের শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তরগুলোকে একত্র করে দিয়েছিলেন। ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩)

৭ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত