মানুষ নিজের পরিবার, পেশা ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকে। কিন্তু নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়টি অনেক সময় ভুলে যায়। সে ভুলে যায়, সে আল্লাহর বান্দা। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের আত্মবিস্মৃত করেছেন। তারাই তো ফাসেক।’ (সুরা হাশর ১৯)
আয়াতটি মানুষের জীবনের গভীর একটি সত্য তুলে ধরে। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া শুধু ইবাদত কমে যাওয়ার নাম নয়। এর প্রভাব মানুষের পুরো জীবনে পড়ে। মানুষ তখন নিজের প্রকৃত কল্যাণের কথাও ভুলে যায়। কোন পথে তার মুক্তি, কোন কাজে তার ক্ষতি, কোন জীবন তার জন্য সফলতার এবং কোন জীবন তার জন্য ধ্বংসের, সেসবের বোধ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়।
আল্লাহকে ভুলে যাওয়া মানে এই নয় যে মানুষ মুখে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করবে। বরং জীবনে আল্লাহর নির্দেশকে উপেক্ষা করাও এক ধরনের বিস্মৃতি। মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর বিধানের ওপর প্রাধান্য দেয়, তখন সে ধীরে ধীরে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে ফেলে। সে নামাজের গুরুত্ব ভুলে যায়। গুনাহকে ছোট মনে করে। হালাল হারামের সীমারেখা নিয়ে উদাসীন হয়ে পড়ে। দুনিয়ার অর্জনকে জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা মনে করে। এভাবেই শুরু হয় আত্মবিস্মৃতি।
আল্লাহ মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। তিনি বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬)
এই আয়াত মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে। মানুষ কাজ করবে। পরিবার পরিচালনা করবে। জীবিকা উপার্জন করবে। সমাজে দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু এসবের কেন্দ্রবিন্দু হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
যখন মানুষ এই উদ্দেশ্য ভুলে যায়, তখন জীবনের হিসাবও বদলে যায়। অর্থ-সম্পদ তখন হয়ে ওঠে সবকিছু। পদমর্যাদা হয়ে ওঠে পরিচয়ের মাপকাঠি। মানুষের প্রশংসা হয়ে ওঠে সাফল্যের মানদণ্ড। অথচ এগুলো কোনোটিই মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়।
আল্লাহর স্মরণ মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। অন্তরকে জাগ্রত রাখে। সে বুঝতে পারে, পৃথিবীতে তার অবস্থান সাময়িক। তার হাতে থাকা সবকিছু আমানত। একদিন তাকে ফিরে যেতে হবে আল্লাহর কাছে।
তাই মুমিন নিজের কাজের হিসাব নেয়। সে নিজেকে প্রশ্ন করে। আমার আজকের কাজ কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করেছে? আমার উপার্জন কি হালাল? আমার কথা কি কাউকে কষ্ট দিয়েছে? আমার গোপন জীবন কি প্রকাশ্য জীবনের মতোই পবিত্র? এই আত্মজিজ্ঞাসাই মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।
মানুষের জীবনে ব্যস্ততা থাকবে। দায়িত্ব থাকবে। চিন্তা থাকবে। প্রয়োজন থাকবে। কিন্তু ব্যস্ততা যেন তাকে তার স্রষ্টার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা হাশর ১৮)
এখানে আগামী দিন বলতে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই বুদ্ধিমান মানুষ শুধু আজকের প্রয়োজন নিয়ে ভাবে না। সে আগামী জীবনের প্রস্তুতিও নেয়।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক
