৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত প্রতিবেদন ৭ জুনের মধ্যে

১৩ বছর আগে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ কেন্দ্র করে হত্যাকান্ডের মামলার তদন্তে ওই ঘটনায় দেশের একাধিক জেলায় নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি আরও বলেছেন, এ হত্যাকান্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার তদন্ত ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রতিবেদন আগামী ৭ জুনের মধ্যে দেওয়া সম্ভব হবে। গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ জানান তিনি। এর আগে গত ৩ এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের বলেছিলেন ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে শুধু মতিঝিলে ৩২ জন নিহত হন। 

শাপলা চত্বরের ঘটনায় শত শত বা হাজারো মানুষের নিহতের দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, রাজনৈতিক ময়দানে বা সেমিনারে বলা আর আমাদের তদন্তের মধ্যে পার্থক্য আছে। তদন্তের বাইরে আমরা কিছুই বলতে পারব না। তিনি বলেন, আমাদের তদন্তে এ পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা মিলিয়ে মোট ৫৮ জনের নিহতের ঘটনা শনাক্ত করতে পেরেছি এবং তাদের পরিচয় পেয়েছি।

তিনি বলেন, শাপলা চত্বরে বা ঢাকার মধ্যে ৩২ জন নিহত হয়েছেন। পরের দিন নারায়ণগঞ্জে আরও প্রায় ২০ জনের মতো নিহত হন। একই দিন চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লাতে একজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তাদের কথাবার্তা হয়েছে এবং  পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকান্ডের ঘটনাকে ‘সিস্টেমেটিক’ ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক’ এবং ‘টার্গেটেড কিলিং’ দাবি করে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, “তৎকালীন সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) উদ্দেশ্য ছিল, এই ইসলামিক সংগঠনটিকে একেবারেই নিধন করে দেওয়া। তাদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে খুন করতে হবে এটা সবটাই ‘সিস্টেমেটিক, ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক এবং টার্গেটেড কিলিং’।”

এই হত্যাকা-ের পর হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে পরবর্তীতে শেখ হাসিনার বৈঠক এবং তাকে (শেখ হাসিনা) ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়ার বিষয়টি তদন্তে প্রভাব ফেলবে কি না এমন প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক কার্যক্রম একরকম, আর আমাদের বিচারের পরিধি আলাদা। হত্যাকা-ের পরের ওই রাজনৈতিক ঘটনাগুলো সঙ্গত কারণেই আমাদের তদন্তে আসবে না, আসা উচিতও না।’ শাপলা চত্বর হত্যাকান্ডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মামলার আসামি ৩০ জনের কম হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সব আসামির নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত কমিশন চান জামায়াত আমির : ১৩ বছর আগে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকা-ের ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে উন্মোচনের দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। পাশাপাশি হত্যাকা-ের জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, এই হত্যাকান্ড দেশের ইতিহাসে এটি একটি বেদনাবিধুর ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেদিন ধর্মপ্রাণ তাওহিদী জনতার ওপর যে নির্মম অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তা জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই নারকীয় হত্যাকা- মানবতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী একটি জঘন্যতম ঘটনা। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশের জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। সেই অধিকারকে দমন করতে শক্তি প্রয়োগ এবং প্রাণহানির ঘটনা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। তিনি দেশবাসীর প্রতি শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।