আমাদের কারাগারগুলো নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা দীর্ঘদিনের। এর সংগত কারণও রয়েছে। কারাগারগুলো এখনো সংশোধনমূলক হয়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেখানে প্রথমবারের মতো অপরাধীরা গেলেও বেরিয়ে এসে পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হয়। বিস্ময়কর হলো, এসব পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে শিশুদের থাকতে হচ্ছে এবং এটি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। এই নিষ্পাপ শিশুদের জন্য আমরা একটা পৃথক বা যুগোপযোগী কোনো ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থাটাও তৈরি করতে পারিনি, এটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতার কারণে এই শিশুদের মানবাধিকারের চরম বিচ্যুতি ঘটছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, একজন পুরুষ আসামির ক্ষেত্রে শিশুদের তার সঙ্গে রাখতে হয় না। থাকতে হয় মায়ের সঙ্গে। কেননা একজন দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্য মা একটি বড় আশ্রয়। কিন্তু এমনও দেখা গেছে, মায়ের বিচার কাজ শেষ হচ্ছে না। কিন্তু দিনের পর দিন কোনো কারণ ছাড়াই শিশুসন্তানকে থাকতে হচ্ছে কারাগারের ভেতরে। সেখানে সেল ও ওয়ার্ডগুলোতে তাদের থাকতে হয়, যেখানে অন্য আসামিরা থাকে। এর মানে হলো, নিশ্চিতভাবেই ওই শিশুগুলো চিহ্নিত আসামিদের সংস্পর্শে আসছে।
যখন শিশুর বোঝার বয়স ৪, ৫ বা ৬ বছর, তখনই কিন্তু শিশুদের মধ্যে বড়দের নেতিবাচক দিকগুলো চোখে পড়ে এবং তারা এসব শিখে। আর কারাগারের মতো জায়গায় এই নেতিবাচক দিকগুলো পড়বে সবচেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে যেসব শিশু কারাগারের ভেতরে আছে তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন বা ভবিষ্যতে কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।
আমাদের ভাবতে হবে, এই পরিস্থিতিতে আমাদের কি করা উচিত। কোনো বিকল্প কী নেই? আমাদের ফৌজদারি আইনে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু নমনীয়তার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে গিয়ে এর প্র্যাকটিসটা খুব বেশি দেখা যায় না। এর মধ্যে হত্যা বা মাদকের মতো গুরুতর অপরাধের মামলাও রয়েছে। যেখানে অনেক সময় নমনীয়তার সুযোগ থাকে না। তবে অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধ বা অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে যারা প্রথমবারের মতো আইনের আওতায় আসেন এবং যাদের শিশুসন্তান রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কী ধরনের সিদ্ধান্তের সুযোগ রয়েছে তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচার নিষ্পত্তি কিংবা অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত বিবেচনার সুযোগ রাখা যায় কিনা ভেবে দেখতে হবে। না হলে দিনের পর দিন ভুক্তভোগী শিশুদের জীবন নিশ্চিতভাবেই বিপন্ন হবে।
লেখক : মানবাধিকারকর্মী