জুলাই জাদুঘরের দুয়ার খুলল

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৪ এএম

‘তোমরা হয়তো যাইবা ভুলে/খুনি হাসিনার ইতিহাস/সেই মায়ে রাখবো মনে/যে ছুঁইছে পোলার লাশ’। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই থমকে দাঁড়ান ইট কালারের দেয়ালে সাদা রঙের এই লেখার সামনে। এই লেখার পাশ দিয়েই বহির্গমন গেট। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জুলাই জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঢাকা, এর আশপাশ ও দেশের বিভিন্ন স্থানের দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের চিহ্ন। গেট থেকে মূল ভবনে প্রবেশের সময় এক স্বামী তার স্ত্রীকে বলছিলেন, ‘কখনো কি চিন্তা করেছ এখানে প্রবেশ করতে পারবে? শেখ হাসিনা পালিয়েছে, তাই আমাদের ঢোকার সৌভাগ্য হলো।’ এ কথা বলতে বলতে তারা গিয়ে দাঁড়ালেন ডান পাশের ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে লাল রঙে ‘লেখা হাসু আপা পালাইছে’। এরপর তারা ঘুরে দেখতে শুরু করেন।

আগে যেটি ছিল ঐতিহাসিক গণভবন, সেটিই এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। আর এই গণভবনেই থাকতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এখনো তিনি সেখানেই আছেন। তিনি চলে যাওয়ার পর গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় গত ৫ আগস্ট জাদুঘর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওইদিন বিকেলে জুলাই যোদ্ধাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এর পরের দিন বৃহস্পতিবার উন্মুক্ত করা হয় সবার জন্য। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিট মূল্য ৫০ টাকা আর শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে জাদুঘরে প্রবেশের সময় টিকিট কাউন্টারের সামনে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।

তবে শুরুতেই টিকিটের ব্যবস্থা চালু করায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, অন্তত ১৫ দিন দেশের জনগণের জন্য বিনামূল্যে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। রাজধানীর উত্তরা থেকে আসা ইমরান শেখ বলেন, ১৫ দিন যদি প্রবেশ ফ্রি রাখা হতো তাহলে ভালো হতো। আমি তো পত্রিকা দেখিনি। ভেবেছিলাম এসে এখন বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারব। কিন্তু তা পারলাম না। প্রবেশ করতে ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট নিতে হয়েছে।

প্রবেশ গেট দিয়ে একটু এগোলে চোখে পড়ে ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকা-ের পর শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কফিন কাঁধে কান্নারত সেনা কর্মকর্তাদের ভাস্কর্য। এরপর রয়েছে প্রতীকী কবরস্থান। কবরস্থানের চারপাশ ঘিরে ২০০৮ থেকে ২০২৪ এর ৩৬ জুলাই পর্যন্ত শহীদ হওয়া প্রায় চার হাজারের বেশি শহীদের নাম খোদাই করা। শেখ হাসিনার শাসনামলে ক্রসফায়ার, গুম এবং প্রতিবাদী নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করা হয়। বহু মানুষকে এমনভাবে চিহ্নহীন করে ফেলা হয়েছে, যেন তারা কখনো ছিলেনই না। অনেকের লাশ নদীতে, রেললাইনে কিংবা গণকবরে পাওয়া গেলেও অনেকেই আর ফিরে আসেননি। কোথাও তাদের কোনো চিহ্নও নেই। জিয়ারত করার জন্য একটা কবর পর্যন্ত নেই অনেক পরিবারের জন্য। এখানেই রয়েছে সেই সব শহীদের নাম।

এর ডান পাশে রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্মমতার আরেক চিহ্ন ‘আয়নাঘর’। আয়নাঘরকে ‘হাসপাতাল’ নামে ডাকত। এটি ছিল বাহিনীর কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। হাসিনার জুলুমের অন্যতম নিদর্শন হলো এই আয়নাঘর। দেশের জনগণকে তুলে নিয়ে বছরের পর বছর গুম করে রাখা হতো এই বন্দিশালায়।

এই আয়নাঘরে প্রবেশ করে অনেকেই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ লোহার সিকের ভেতরে গিয়ে স্মৃতি হিসেবে ছবি তুলে রাখেন। প্রতীকী আয়না ঘরে কথা হয়, চট্টগ্রাম থেকে আসা সিয়াম নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই শেখ হাসিনার শাসনামলে যেভাবে মানুষকে এই আয়নাঘরে রেখে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, তাকেও দেশে ফিরিয়ে এনে এই ঘরে কিছু দিন রাখা হোক। আমরা আর কোনো আয়নাঘর দেখতে চাই না। সব শাসকের জন্য এটা একটা বিশেষ বার্তা। যদি কেউ শেখ হাসিনা হতে চেষ্টা করেন তাহলে তাকেও হাসিনার মতো পালাতে হবে। আমরা চাই দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকতে পারে। কারও মায়ের সন্তানকে যেন আর আয়নাঘরে থাকতে না হয়।’

আজিমপুর থেকে জাদুঘর দেখতে আসা তাজিন আক্তার বলেন, ‘এখানে না এলে বুঝতেই পারতাম না শেখ হাসিনার শাসনামলে মানুষের ওপর কতভাবে নির্যাতন হয়েছে। আমি দেখছি আর আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। সবারই একবার এসে দেখা দরকার। যারা এখানে আসবেন শেখ হাসিনার প্রতি তাদের ঘৃণা আরও বাড়বে।’

জাদুঘরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই লাল টেলিফোন যেন বিনোদনের অন্যতম স্থান। সেখানেই সকাল থেকে ভিড় লেগে ছিল। নির্দিষ্ট নাম্বারে ডায়াল করে একের পর এক দর্শনার্থী শুনতে থাকেন সেই সময়ে শেখ হাসিনার কথোপকথন। একবার শুনে কেউ কেউ ব্যঙ্গও করেন। এই রুমে যারাই এসেছেন বেশিরভাগই লাল টেলিফোন কানে নিয়ে ছবি তুলেছেন কিংবা ভিডিও করেছেন।

এখানে কথা হয় বাড্ডা থেকে আসা মোতালিব হোসেনর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার লোভ শেখ হাসিনাকে অমানুষ বানিয়ে দিয়েছিল। তা না হলে তিনি এত মানুষের ওপর এত নিষ্পেষণ চালাতে পারতেন না। তার নাম মুখে আনতেও আমার ঘৃণা লাগে।’

জুলাই আন্দোলনের সময় যে ঘটনাগুলো মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়, তার মধ্যে একটি রিকশার পাদানিতে চিৎ করে ফেলে শহীদ গোলাম নাফিজের মরদেহ নিয়ে যাওয়া এবং পুলিশের গাড়ি থেকে শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের দেহ নিচে ফেলার দৃশ্য। মূল ফটক থেকে প্রবেশ করে বাম পাশে রয়েছে এই দুটি ভাস্কর্য। ভাস্কর্য দুটির কাছে দশনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আওয়ামী দুঃশাসনের চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছেপিলখানায় হত্যাকা-, শাপলাচত্বরের ঘটনা, হাসিনা সরকারবিরোধীদের গুম, খুন, হামলা, মামলা ও দমন পীড়নের প্রমাণ। এসব নিয়ে করা হয়েছে ভাস্কর্য। রাখা হয়েছে আলোকচিত্রসহ বিভিন্ন কিছুর দলিল।

স্বৈরাচার হাসিনার শাসনামলের অমানবিক অত্যাচার ও ক্ষমতার নৃশংসতার সাক্ষী টর্চার রুম। এখানে প্রদর্শিত যন্ত্র ও সরঞ্জামগুলো কেবল ধাতব বস্তু নয়, এগুলো বন্দিদের ওপর চালানো সীমাহীন নির্যাতনের প্রত্যক্ষ বিবরণ। এই রুমের বাইরে বারান্দায় কাপড়ে সেলাইয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গুম হয়ে যাওয়া পাহাড়ি অ্যাক্টিভিস্ট মাইকেল চাকমার আয়নাঘরে দুর্বিষহ বন্দিত্বের দিনগুলো।

জুলাই অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল আশাতীত, অসামান্য ও স্বতঃস্ফূর্ত। জুলাই আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান পুরুষের সমান বা কখনো তারও বেশি। ঘর থেকে, কলেজ থেকে, কর্মস্থল থেকে তারা বের হয়ে এসেছিল রাজপথে। কখনো মিছিলে, কখনো ঢাল হয়ে, কখনো লেখালেখি করে ও কোটা বর্জন করে তারা ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে সরব। জুলাইয়ে নারীর অনন্যসাধারণ ভূমিকার চুম্বক অংশই তুলে ধরা হয়েছে জুলাই নারী সেকশনে। নারী শহীদদের তালিকা ও নারী আন্দোলনকারীদের মূল্যবান জিনিস সংগৃহীত আছে এখানে।

জুলাই জাদুঘরের টয়লেটে জনস্বাস্থ্য উপেক্ষিত। টয়লেটে গিয়ে বিব্রত দর্শনার্থীরা। পাবলিক টয়লেটে সাবান রাখার জায়গা নেই। হাত শুধু পানিতে ধুতে হয়। তিনটা বেসিন আছে। কিন্তু সাবান রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। তিনটা টয়লেট, চারটা প্রসাবের প্যান। টয়লেটের ভেতরেও সাবান রাখার ব্যবস্থা নেই। শুধু টিস্যু রাখার ব্যবস্থা আছে। টয়লেট নিয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত