ষাটোর্ধ্ব ষষ্ঠীচন্দ্র বর্মণের মুখভর্তি সাদা দাড়ি, রোদে পোড়া ক্লান্ত চেহারা, কোমরে গুটিয়ে বাঁধা লুঙ্গি, দুই হাত পেছনে মোড়ানো খালি পায়ে হাঁটছিলেন তিনি, সীমান্তবর্তী ক্ষেতে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মধ্যবর্তী ‘শূন্যরেখা’ থেকে দুই দেশের দিকে আসা-যাওয়া করছিলেন তিনি; যখনই বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছিলেন, বিজিবি সদস্যরা তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল; যখন ভারতের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন বিএসএফ সদস্যরা বাধা দেয়। তাকে ঘিরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ও হয়।
শূন্যরেখায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা কেটেছে তার; কিন্তু নিজের দেশ, নিজের মানুষ আর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো এ বৃদ্ধের আর্তি কারও মন ছুঁতে পারেনি। ১১ জুন সকালে তাকে বাংলাদেশে এনে থানায় হস্তান্তর করা হয়। ১০ জুন সকালে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া-কামালপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় তাকে রেখে যায় বিএসএফ। ওই ২৪ ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম এবং অপমানজনক অধ্যায়।
গত ১৩ জুন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গোয়তাপাড়া সীমান্তের জিরো লাইনে ছয়জনকে ঠেলে দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিএসএফ। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির এবং স্থানীয়দের বাধায় তারা বাংলাদেশে ঢুকতে না পেরে শূন্য রেখাতেই আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে ছিলেন বেলাল হোসেন, তার স্ত্রী সুমি আক্তার এবং তাদের ছয় মাস ও চার বছর বয়সী দুই সন্তান। পাঁচ দিন খোলা আকাশের নিচে না খেয়ে, রোদ-বৃষ্টি, মশা-পোকার উপদ্রবে মানবেতর জীবন কাটে তাদের। অসুস্থ হয়ে পড়ে দুই শিশু। ১৭ জুন বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠকের পর চারজনকে দেশে ফিরিয়ে আনে বিজিবি।
দেশে ফিরে তারা জানান, পাঁচ দিন মাথার ওপর ছাউনি ছিল না, পায়ে জুতা ছিল না। ক্ষুধায় কখনো কাঁচা ঘাস, কখনো ধানের শিষ চিবিয়ে কাটিয়েছেন। তৃষ্ণায় ডোবার পানি বা জমে থাকা পানিতে ঠোঁট ভিজিয়েছেন। রাতে অন্ধকারে নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে।
শুধু এ পাঁচজনই নন, আরও অনেককে জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিএসএফ। বাংলাভাষী হওয়ায় প্রতিদিন কোনো না কোনো সীমান্ত দিয়ে সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে দুই দেশই গ্রহণ না করায় তারা সীমান্তের ‘শূন্যরেখায়’ আটকা পড়ছেন। কারও একদিন, কারও পাঁচ-সাত দিন খোলা আকাশের নিচে এক কাপড়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে। আটকে পড়াদের মধ্যে বৃদ্ধ, নারী ও ছোট শিশু-সন্তানসহ পরিবারও রয়েছে। পরে অনেককে বিএসএফই ফিরিয়ে নিচ্ছে। চরম অনিশ্চয়তা, দুর্ভোগ ও মানবিক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে এসব মানুষকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধভাবে বসবাস করলেও আইনি কাঠামোয় তাদের পুশইন করার সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে সম্মানের সঙ্গে তাদের পাঠাতে হবে।
গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনের পর পুশইনের ঘটনা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। সম্প্রতি দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশ এ ধরনের পুশইনকে অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানালেও কার্যকরী সমাধান হয়নি। ফলে সীমান্তে জোরপূর্বক মানুষকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিজিবির উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা হচ্ছে। রাতের আঁধারে অনেককে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। যাকে ঠেলে দিচ্ছে, সে সন্ত্রাসী কিনা তা জানা দরকার। তাই আমরা রুখে দিচ্ছি। কারণ, এটা বেআইনি। বাহিনী হিসেবে আমাদের আইন মেনে চলতে হবে। আইন মেনে সম্মানের সঙ্গে পাঠালে আমরা তাদের গ্রহণ করব।’
কয়েকটি ঘটনা : ঝিনাইদহের ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মুন্সী ইমদাদুর রহমান জানান, ‘২৫ জুলাই ভোরে মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে ৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তাদের দুইজন নারী। তাৎক্ষণিকভাবে সে চেষ্টা প্রতিহত করে বিজিবি।’
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, চতুর্দিক পানি, তার মধ্যে একটি ক্ষেতের আইলের ওপর ছয়জন জড়ো হয়ে বসে আছেন। তাদের সঙ্গে জামাকাপড়ের ব্যাগ। তাদের ছিল না কোনো খাবার, এমনকি পানি। খোলা আকাশের নিচে তপ্ত রোদের ভেতরে হাঁসফাঁস করছে তারা। আশপাশে কোনো স্থাপনা বা আশ্রয়ের স্থান নেই। একপর্যায়ে বিএসএফ ছয়জনকে ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে।
২৪ জুলাই ভোর ৫টায় কুষ্টিয়ার জয়পুর সীমান্ত দিয়ে ১৪৬ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের চর মেঘনা ক্যাম্পের সদস্যরা অজ্ঞাতপচিয়ের ২ জন পুরুষ, ৪ জন মহিলা ও ২ জন ট্রান্সজেন্ডারসহ মোট ৮ জনকে নদীপথে সাঁতরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকানোর চেষ্টা করে। ব্যাগ ও জুতা হাতে তারা সাঁতরে একটি পাট ক্ষেতে ওঠেন। সেখানে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন। বিজিবিও তাদের গ্রহণ করছে না। একপর্যায়ে তারা নদীপথেই ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
এর আগের দিনও চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ৩২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের গেদে ক্যাম্পের সদস্যরা নারী ও শিশুসহ ৫ জনকে ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। মশা, পোকামাকড় আর সাপ-বিচ্ছুর আতঙ্ক মাথায় নিয়েই ঝোপঝাড়ে অবস্থান নেয় পরিবারটি। বিজিবি প্রতিহত করলে তারা ভারতের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এর আগে-পরেও অসংখ্য মানুষকে পুশইন করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় বিএসএফ। ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়াসহ প্রায় সব সীমান্তপথেই পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই বিএসএফ কাউকে না কাউকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে। দূর থেকে মানুষকে শূন্য রেখায় বসে থাকতে দেখা যায়। রোদের মধ্যে আইলের ওপর শুয়ে থাকতে দেখা যায়, তারা খাবারের জন্য আর্তনাদ করে। রাতে নারী ও শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে।
কত মানুষকে পুশইন : বিজিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত পুশইনকৃত ২ হাজার ৫০২ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের জাতীয়তা ও পরিচয় যাচাইসাপেক্ষে বাংলাদেশি ২ হাজার ১৩২ জন, ভারতীয় ১০ জন এবং ভারতে নিবন্ধনকৃত ১৩৯ জন রোহিঙ্গাসহ সর্বমোট ২ হাজার ২৮১ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২২১ জনের মধ্যে ১১৩ জন ভারতীয় এবং ৫৭ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ২১ জন ভারতীয় নাগরিককে বিএসএফের কাছে এবং ৩০ জন এফডিএমএনকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময়ে ১৩৬টি পুশইনের ঘটনায় ১০৪৭ জনকে ঠেকানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ‘ডিটেক্ট ডিলিট ডিপোর্ট’ অভিযান : ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং রাজ্য থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ বক্তব্যের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক অভিযান চলানো হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জন্য জেলায় জেলায় গড়ে তোলা ‘হোল্ডিং সেন্টার’। সেখান থেকে রাতের আঁধারে জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ। বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ পুশইনের ঘটনা ঘটেছে রাতে; বিশেষ করে ভোর ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে।
আন্তর্জাতিক আইন : আন্তর্জাতিক আইনে পুশ-ইন বা পুশব্যাকের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটি সাধারণত নন-রিফাউলমেন্ট বা অপ্রত্যর্পণ নীতির লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩(১) ধারা অনুযায়ী নন-রিফাউলমেন্ট নীতি প্রযোজ্য। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে পাঠানো যাবে না যেখানে তার প্রাণ বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। এ নীতি অন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতেও অন্তর্ভুক্ত। পুশইন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ফেরত পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী। বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান পুশইন নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই আইনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন।
নিরাপত্তা-বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি অবৈধভাবেও বসবাস করে, আইনি কাঠামোয় তাদের পুশইন করার সুযোগ নেই। কাউকে আটক করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নিয়ম আছে। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া বসবাস করলে গ্রেপ্তার করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হয়। যদি ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার সাজা হবে। সাজা শেষে যে দেশ থেকে এসেছে সেই দেশে ফেরত পাঠানোর নিয়ম। সীমান্তে চাপ তৈরি করতেই পুশইন।’
