পুলিশে ত্রিমুখী উদ্বেগ

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৩ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্তর্বর্তী সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও জনপ্রতিনিধির অভাবে ব্যাহত হয় নাগরিক সেবা। এমতাবস্থায় আগামী অক্টোবর নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি সরকার। আবার গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশও আক্রান্ত হয়। সেই ট্রমা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাহিনীর সদস্যরা। এদিকে আওয়ামী লীগ আমলের নির্বাচনগুলো ছিল একপেশে। সেক্ষেত্রে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্থানীয় নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন।

মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যেকোনো ধরনের আকস্মিক রাজনৈতিক সহিংসতা এড়াতে এখন থেকেই বিশেষ পরিকল্পনা সাজাচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের বিশেষ বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। সপ্তাহ খানেক আগে পুলিশ সদর দপ্তরেও এ সংক্রান্ত বিশেষ বৈঠক হয়। বৈঠকে দাগি অপরাধীদের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। পাশাপাশি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশের স্থাপনাগুলো থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন প্রশাসন।

বৈঠকে বেশকিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে দ্রুত অপরাধীদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া আছে, তারা যেন নির্বাচন করতে না পারেন, এমনকি আওয়ামী লীগের ব্যানারে যাতে কেউ নির্বাচন করতে না পারেন, তার বিশেষ নজরদারি করতে হবে। দাগি অপরাধীরা কোনো প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার প্রমাণ মিললেই গ্রেপ্তার করতে হবে। ইতিমধ্যে আরও বেশকিছু নির্দেশনা দিয়ে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ ও তৎপরতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন সবসময়ই তৃণমূল রাজনীতির সবচেয়ে বড় উৎসব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরকে এলাকার নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরূপণের জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

আ.লীগ নেতাদের নির্বাচন করা নিয়ে সমীকরণ : সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির স্থানীয় নেতারা অংশ নিতে পারেন বলে জোর আলোচনা আছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে, যা পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলটির নেতারা একচেটিয়াভাবে ক্ষমতায় ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান কিংবা মামলার আসামি হন। বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে আসায় অনেক সাবেক জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতা পুনরায় নির্বাচনী মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে ছাত্রসমাজসহ সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হচ্ছে। তারা পুলিশকে জানিয়েছে, ‘বিগত দিনের দমন-পীড়ন এবং ভোট চুরির সঙ্গে জড়িতদের কোনোভাবেই আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়া হবে না।’ আওয়ামী লীগের কোনো পরিচিত নেতা স্বতন্ত্র বা ডামি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন, তবে স্থানীয় পর্যায়ে তাৎক্ষণিক গণবিক্ষোভ বা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটার শঙ্কা আছে।

পুলিশের একাধিক চ্যালেঞ্জ : পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুলিশে বড় ধরনের রদবদল, সংস্কার ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ এখনো চলমান। অনেক কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়ে এলাকার অপরাধ চিত্র ও সামাজিক অবস্থা বুঝে উঠতে সময় নিচ্ছেন। স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে সাধারণত ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত বিরোধ থাকে। তাই সহিংসতা দমনের জন্য পর্যাপ্ত ফোর্স মোতায়েন ও গোয়েন্দা নজরদারি বজায় রাখা কঠিন।

বিশেষ অভিযানেও হচ্ছে না কাজ : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক নামে বিশেষ অভিযান চালানো হলেও দাগি অপরাধীরা আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদেরও বড় একটি অংশ জামিনে মুক্তি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই দফায় ডেভিল হান্ট অপারেশন চালালেও তা কাজে আসেনি।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে বিশেষ অভিযানও চালানো হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করার সাহস দেখাবে তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

ট্রমা কাটছে না পুলিশের : পুলিশ কর্তারা বলছেন, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে-পরে পুলিশের ওপর ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে। কর্তব্যরত অবস্থায় একের পর এক পুলিশ সদস্য আহত হচ্ছেন। এতে বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে তাদের মানসিক ও পেশাদারত্বে বড় ধরনের চিড় ধরেছে। পুলিশের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব বা আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা নাগরিকদের নিরাপত্তায় সর্বদা সচেষ্ট। কিন্তু যখন আমরা আক্রান্ত হই, তখন নিজেদের খুব অসহায় লাগে। হামলা করেও যখন পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকে, তখন পরের বার বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটা থাকে না। স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। ইতিমধ্যে আমরা তথ্য পেয়েছি, আওয়ামী লীগের নেতারাও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন করবেন, যা উদ্বেগের। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে।

লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বেশি ভয় : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা-ফাঁড়িতে হামলা হয়। এ সময় ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। এখনো ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। লুট হওয়া অস্ত্র হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তাই পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি অংশ সন্ত্রাসীদের কাছে আছে।

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের শঙ্কা : পুলিশের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের জন্য অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে। এমনকি একই দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার অনুসারীরা এলাকা দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠ প্রশাসনে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক দাগি অপরাধীসহ অস্ত্রধারীদের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে যারা অতীতে নির্বাচনী সহিংসতা ঘটিয়েছে, তাদের ওপর কড়া নজরদারি রাখা ও পেন্ডিং থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত কার্যকরের নির্দেশ রয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই যেন চিহ্নিত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যায়, সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করবে। সাম্প্রতিক সময়ে যারা জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাদের গতিবিধি এবং তারা কোন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন তার তথ্য নিচ্ছে গোয়েন্দারা।

নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ : পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি অনুরাগ বা বিরাগ দেখানো যাবে না। অতীতে পুলিশের বিরুদ্ধে যে ‘দলকানা’ তকমা ছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার এটাই উপযুক্ত সুযোগ। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী সহিংসতা রোধে প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ছাত্র প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে  ‘সম্প্রীতি ও শান্তি কমিটি’ গঠন করতে বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত