সাড়ে চার লক্ষ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা

বাঁশখালীর চাদপুর বেলগাঁও বাগানটি ক্লোন চা উৎপাদনে দেশসেরা

দক্ষিণ চট্টগ্রামের একমাত্র পর্যটন স্পট বাঁশখালীর চাদপুর বেলগাঁও চা-বাগানটি গুটি গুটি বৃষ্টির ফোঁটায় ফিরে পেয়েছে প্রাণ। সবুজায়িত হয়ে উঠছে বাগানের সর্বত্র। আর সবুজের এ মহাসমারোহ দেখার জন্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন শতশত পর্যটক চা বাগানটি এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী এই চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানে চলতি বছরে ২০২৬ সালে সাড়ে ৪ লাখ কেজি চা পাতা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্লোন চা উৎপাদনের কারণে বৈলগাঁও চা বাগানটি বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ মানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগান হিসেবে পরিচিত। চায়ের বাজারে দেশের প্রতিযোগিতায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকবার সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এ চা বাগানের উৎপাদিত চায়ে যেমন পুষ্টিগুণ রয়েছে, তেমনি দেশজুড়ে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন এই চা বাগানটি বাঁশখালীর অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও পরিচিত। বিগত ২০১৬ সাল এ চা বাগানের ব্যবস্থাপক হিসাবে নিরলস ভাবে দায়িত্ব পালন করছে মো আবুল বাশার। 

এক সময়ের একনিষ্ট সহযোগি কর্মকর্তা থেকে পরবর্তীতে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে চা উৎপাদন ও আবাদী জমির পরিমাণ বৃদ্ধি সহ পায়। বাগানের শোভা বর্ধনের জন্য রয়েছে কয়েক একর জুড়ে রয়েছে বিশাল আম বাগানও। বর্তমানে বাগানটিতে ম্যানেজার, সহকারী ম্যানেজার, বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৭ শতাধিক শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।

দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এ চা বাগানে আসা যাওয়ার পথে প্রায় ৩ কিলোমিটার সড়কের ভোগান্তি বিগত কয়েকযুগ ধরে। বাগান কর্তৃপক্ষ নানা সময়ে সরকারের দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আবেদন নিবেদন করেনি সংস্কারের মুখ দেখেনি । ফলে চা বাগান দেখতে আসা পর্যটক সহ সাধারন জনগন এবং চা বাগানের প্রয়োজনীয় মালামাল আনা নেওয়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। 

সুত্র মতে, ১৯১২ সালে ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা এ বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় বাগানের ম্যানেজার ছিলেন মি. হিগিন। বাংলাদেশ চা বোর্ড ১৯৯২ সালে চুক্তির মাধ্যমে চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানের ব্যবস্থাপনা বাঁশখালী টি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে। 

পরবর্তীতে ২০০৩ সালে ব্র্যাক কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে এটি ‘ব্র্যাক বাঁশখালী টি কোম্পানি লিমিটেড’ নামে পরিচালিত হয় এবং ২০০৪ সালে চা কারখানা চালু করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর ব্র্যাকের কাছ থেকে সিটি গ্রুপ পরিচালিত ভ্যান ওমেরান ট্যাংক টার্মিনাল (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল অয়েল মিলস্ লিমিটেড চা বাগানটির মালিকানা ক্রয় করে। 

বাংলাদেশের ১৬২টি চা বাগানের মধ্যে গুণগতমান বিবেচনায় ২০২৫ সালে চাদপুর বৈলগাঁও চা বাগান জাতীয় পর্যায়ে ১৫তম এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩য় স্থানে অবস্থান করে। বর্তমানে বাগানের সাড়ে ৭০০ একর জমি আবাদাধীন, যার প্রায় ৯০ শতাংশ ক্লোন চা। চা উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

উপযোগী বৃষ্টিপাতের ভিত্তিতেই উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ২০০২ সালে ৮০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা বাগানটি ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কেজি চা পাতা উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে। শীত মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। চা বাগানের ভেতরে শ্রমিকদের জন্য রেশন, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান কর্তৃপক্ষ। আধুনিক পদ্ধতিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রয়েছে।

চাদপুর বেলগাঁও চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, বাঁশখালীর এই বিশাল চা বাগানের চা পাতার সারাদেশে সুখ্যাতি রয়েছে। এই মানের জন্য চা বাগানের কর্মকর্তারা প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ২০২৫ সালে ৪ লাখ কেজি চা পাতা উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে। চলতি বছর ২০২৬ সালে সাড়ে ৪ লাখ কেজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।’ তিনি আরও বলেন, আমাদের উৎপাদন যত বৃদ্ধি পায় সরকার রাজস্ব তত বেশি পায়। 

বর্তমানে চা পাতার বিক্রিত অর্থ থেকে সরকার ১৫% হারে ভ্যাট পান। তবে তিনি বাগানের কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, চা বাগানের চারপাশে ঘেরা বেড়া না থাকায় প্রতিদিন হাতির পাল চা বাগানে ছুটে আসে। ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রায় শঙ্কিত থাকে। তিনি সরকারি এই রাজস্ব আয়ের অন্যতম চা-বাগানের সড়ক সংস্কার সহ সরকারের আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।