বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল, ভেতরে সব শেষ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:১০ এএম

বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই ভেতরের ক্ষত। রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে টিনশেড বাড়িটির সামনের পাকা দেয়াল। আপাতদৃষ্টিতে অক্ষত মনে হলেও, সেই দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে আছে এক পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের নির্মম গল্প। সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ঘরের ভেতরের সব মাটির দেয়াল ধসে পড়ে তছনছ হয়ে গেছে বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মিনজীরিতলা গ্রামের তাকোয়া বেগমের (৫০) সাজানো-গোছানো সংসার। বাইরে থেকে ঘরটি ভালো দেখায় বলে বন্যার এত দিন পরও কেউ খোঁজ নেয়নি এই অসহায় পরিবারটির।

শনিবার দুপুরে সরলের মিনজীরিতলা দুর্গত এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এই প্রতিবেদকের সামনে এসে দাঁড়ান স্বামীহারা তাকোয়া বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাজি, আমার বাড়ির সামনের দেয়ালটি ঠিক থাকায় কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। সবাই ভাবে আমি ভালো আছি। আমার বাড়িটা একবার এসে দেখে যান। বাইরে দেখে কেউ বুঝবে না যে আমার সবকিছু শেষ!’

তার আকুতি শুনে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সামনের দেয়ালটি কেবল কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে, আর ভেতরে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র ও পরিধেয় বস্ত্র ভেজা মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার হয়ে আছে। মাটির দেয়ালগুলো এখনো খসে খসে পড়ছে। আশ্রয় হারিয়ে বর্তমানে পাঁচ সদস্যের পরিবারটি বাধ্য হয়ে অন্যের ঘরে রাত যাপন করছে।

তাকোয়া বেগম বলেন, ‘স্বামী ক্যান্সারে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন। রেখে গেছেন ঋণের বোঝা। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও কেড়ে নিল সর্বনাশা বন্যা। আমরা এখন কোথায় যাব?’

তাকোয়া বেগমের দুর্ভোগের শুরু অবশ্য অনেক আগেই। তার স্বামী দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে চিকিৎসা করানোর পর এক বছর আগে তিনি মারা যান। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নেওয়া ঋণের বোঝা পরিবারটি এখনো বহন করে চলেছে।

দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়। তার দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে আমজাদ হোসেন (২২) একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। পা ও চোখসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে সে। তার চিকিৎসা ও দেখভালের ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারটিকে প্রতিনিয়ত সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শনিবারও তাকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। বড় ছেলে আশরাফ হোসেন বিবাহিত। তার স্ত্রী ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। বৃদ্ধ মা, প্রতিবন্ধী ভাই এবং নিজের স্ত্রী-সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পুরো সংসারটি চলছে আশরাফের একার উপার্জনে। দিনমজুর আশরাফ কঠোর পরিশ্রম করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছিলেন। কিন্তু গত ৯ জুলাই শুরু হওয়া টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কবলে পড়ে তাদের শেষ সম্বল বসতঘরটিও ধ্বংস হয়ে যায়। ওই রাতেই চোখের সামনে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে ঘরের ভেতরের মাটির দেয়ালগুলো।

বাইরের অক্ষত দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই পরিবারের অসহনীয় দুর্দশার দিকে এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের নজর পড়েনি। ঋণের বোঝা, প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা এবং গৃহহীন হওয়ার ত্রিমুখী সংকটে পড়ে দিশেহারা পরিবারটি এখন বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রশাসনের মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত