ইসলামি আইনশাস্ত্রের অনন্য ইমাম

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্রের জগতে ইমাম শাফেঈ (রহ.) এমন এক নক্ষত্র, যার বিচ্ছুরিত আলো গত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম উম্মাহকে পথ দেখিয়ে আসছে। প্রখর মেধা, গভীর আধ্যাত্মিকতা এবং ইলমের সন্ধানে দেশান্তর হওয়ার সংকল্প তাকে সমকালীন ও পরবর্তী প্রজন্মের জ্ঞানপিপাসুদের জন্য চিরন্তন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জন্ম ও পরিচয় : ১৫০ হিজরিতে ইমাম শাফেঈ (রহ.) ফিলিস্তিনের গাজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম মুহাম্মাদ, পিতার নাম ইদরিস। তার বংশের ঊর্ধ্বতন পুরুষ শাফে (রা.)-এর নামানুসারে তিনি শাফেয়ি নামেই বিশ্বজুড়ে সমধিক পরিচিত।

তার পূর্ণ বংশপরম্পরা হলো মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস ইবনে আব্বাস ইবনে ওসমান ইবনে শাফে ইবনে সায়েব ইবনে আবিদ ইবনে আবদে ইয়াজিদ ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মানাফ আল-কুরাশি আল-মুত্তালাবি। তার পূর্বপুরুষ শাফে শৈশবে রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। শাফের পিতা সায়েব বদর যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন।

স্বপ্নে নবীজিকে দর্শন : ইমাম শাফেয়ি (রহ.) নিজের একটি স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে বলেন, একদা আমি রাসুল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখি। রাসুল (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে বৎস! কে তুমি? আমি উত্তর দিলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনারই গোত্রের সন্তান। তিনি বললেন, কাছে এসো। আমি নিকটবর্তী হলে তিনি তার পবিত্র লালা আমার জিহ্বা ও মুখে বুলিয়ে দেন এবং দোয়া করে বলেন যাও, আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন। এই স্বপ্নের পর থেকেই তার স্মৃতিশক্তি প্রখরতা লাভ করে।

শৈশব ও শিক্ষা সফর : অল্প বয়সেই তিনি পিতাকে হারান। মাত্র দুই বছর বয়সে মা তাকে নিয়ে পৈতৃক ভূমি মক্কায় চলে আসেন। সেখানেই তার শৈশব অতিবাহিত হয় এবং পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেন। ইলম অন্বেষণে তিনি মক্কা থেকে মদিনায় পাড়ি জমান এবং ইমাম মালিক (রহ.)-এর মৃত্যু পর্যন্ত তার সান্নিধ্যে থেকে ইলম অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাগদাদ এবং সবশেষে মিশরে গমন করেন। তার জীবনের শেষ কয়েক বছর মিসরেই অতিবাহিত হয়।

মর্যাদা ও অবদান : তিনি ইসলামের সোনালি যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ, ফকিহ ও মুহাদ্দিস। হাদিস শাস্ত্রে তার অমর সংকলন ‘মুসনাদুশ শাফেঈ’ এবং ফিকহ শাস্ত্রে তার রচিত ‘কিতাবুল উম্ম’ জগদ্বিখ্যাত মৌলিক গ্রন্থ। তিনি উসুলে ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতি বিষয়ক আর-রিসালা কিতাব রচনা করেন।

উস্তাদ ও ছাত্র : তিনি ইমাম মালিক (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের ছাত্র ছিলেন। আবার তার হাতে তৈরি হয়েছেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতো বিখ্যাত ইমাম।

ইন্তেকাল : ইলমের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ২০৪ হিজরির রজব মাসের শেষ দিন জুমাবার রাতে ৫৪ বছর বয়সে মিসরের কায়রোতে ইন্তেকাল করেন। পরদিন বাদ আসর কায়রোতেই তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার