সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ার উপায়

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:০১ এএম

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আল্লাহতায়ালা শান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী সংসার পরিচালনা করলে দাম্পত্য জীবন সুখময় হয় এবং তা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের মাধ্যম হয়ে ওঠে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তার নিদর্শনাবলির মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা রুম ২১)

আল্লাহভীতি : সুখী সংসারের প্রথম শর্ত হলো আল্লাহভীতি। যে পরিবারে আল্লাহর বিধানকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়, সেখানে পারস্পরিক অধিকার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। আল্লাহভীতি মানুষকে ধৈর্যশীল, সহনশীল ও ন্যায়পরায়ণ করে তোলে। তাই দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করাই প্রকৃত সফলতার পথ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে আর তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের দুজন থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ ও নারী।’ (সুরা নিসা ১)

পারস্পরিক ভালোবাসা : দাম্পত্যে ভালোবাসা দায়িত্ব, যতœ ও সম্মানের সমন্বয় প্রয়োজন। সংসারে ছোট ছোট আন্তরিক আচরণ, হাসিমুখে কথা বলা, খোঁজখবর নেওয়া, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা কিংবা কষ্টের সময় পাশে দাঁড়ানো, এসব বিষয় সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। একজন মানুষের আত্মসম্মানকে আঘাত করে কিংবা সঙ্গীকে অবহেলা করে কখনো সুখী সংসার গড়া যায় না।

সুন্দর কথাবার্তা : দাম্পত্য জীবনে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয় কঠোর ভাষা ও অপমানজনক আচরণের কারণে। অথচ সুন্দর ব্যবহার মানুষের হৃদয় জয় করে, আর কটু কথা হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি ৩৮৯৫) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্রের পরিচয় তার পারিবারিক জীবনে প্রকাশ পায়। বাইরে ভদ্র অথচ ঘরে রূঢ়, এটি ইসলামের আদর্শ নয়।

পারস্পরিক দায়িত্ব আদায় : ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীকে ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও সম্মান প্রদান করা। অন্যদিকে স্ত্রীর দায়িত্ব স্বামীর বৈধ বিষয়ে সহযোগিতা করা এবং সংসারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর নারীদের জন্যও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে।’ (সুরা বাকারা ২২৮) অধিকার দাবি করার আগে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা দাম্পত্য জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য।

ক্ষমাশীলতার চর্চা করা : কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাই ছোটখাটো ভুল নিয়ে প্রতিনিয়ত তর্ক-বিতর্ক করলে সংসারে শান্তি থাকে না। ক্ষমা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলেও অন্য একটি স্বভাব সে অবশ্যই পছন্দ করবে।’ (সহিহ মুসলিম ১৪৬৯)

পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ : সুখী সংসারে একতরফা সিদ্ধান্ত নয়, পারস্পরিক পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।

গোপনীয়তা রক্ষা : স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গোপনীয়তা রক্ষা। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা আত্মীয়-স্বজনের কাছে দাম্পত্য জীবনের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। অথচ ইসলাম এটিকে অপছন্দ করে। নবীজি (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের একজন হবে সেই পুরুষ, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়, স্ত্রীও তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়, তারপর সে তার স্ত্রীর গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম ১৪৩৭)

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত