মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম নামাজ। রাত-দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বান্দা নিজের ওপর অর্পিত ফরজ দায়িত্ব পালন করে। শুধু এ নামাজ আদায় করে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা যায় না। বরং প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত কিছুর। আর তা হলো বিভিন্ন নফল নামাজ। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাজ। মুমিনরা এ নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রেমে নিমজ্জিত হয়।
নিঝুম রাতে যখন পৃথিবী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, চারপাশ নিস্তব্ধতায় ঘেরা, ঠিক তখনই মুমিনের আত্মায় অলৌকিক জাগরণ ঘটে। পার্থিব কোলাহলমুক্ত সেই পবিত্র ক্ষণে মহান আল্লাহর প্রেমে মজে সেজদায় লুটিয়ে পড়ার অনন্য ইবাদত তাহাজ্জুদ।
তাহাজ্জুদ হলো রাতের আঁধারে অন্তরে আলো জ্বালানোর ইবাদত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রবের উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে।’ (সুরা ফুরকান ৬৪)
অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে লক্ষ্য করে আল্লাহতায়ালা তাহাজ্জুদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন আপনার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা ইসরা ৭৯)
রাতের শেষ প্রহরে মহান রবের দরবার থেকে রহমতের বিশেষ ডাক আসে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আমাদের মহান রব প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং বলতে থাকেন, কে আছো যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ (সহিহ বুখারি)
প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা ও পার্থিব দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত আমাদের অন্তরকে মলিন করে তোলে। তাহাজ্জুদ সেই ক্ষতে পরম মলম হিসেবে কাজ করে। তাহাজ্জুদ বান্দার আগের পাপ মোচন করে এবং তাকে সৎপথে অবিচল রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রাতের ইবাদত আঁকড়ে ধরো। কারণ তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার বান্দাদের অভ্যাস, রবের নৈকট্য অর্জনের উপায়, পাপ মোচনের মাধ্যম এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ঢাল।’ (জামে তিরমিজি)
আজকের আধুনিক যুগে মানসিক চাপ ও বিষন্নতা মানবজীবনের বড় সংকট। তাহাজ্জুদ মানুষের মনকে সব ধরনের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেয়। যখন কেউ রাতের অন্ধকারে স্বীয় প্রভুর কাছে মনের সব দুঃখ-কষ্ট উজাড় করে দেয়, তখন তার হৃদয়ে এই পরম নির্ভরতা জন্মায় যে, সে একা নয়।
যে ব্যক্তি নিয়মিত তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হয়, তার চরিত্র ও চেহারায় এক ধরনের প্রশান্তময় নুর ফুটে ওঠে। তাহাজ্জুদ হলো বান্দা ও তার স্রষ্টার মধ্যকার এক গোপন ও খাঁটি সম্পর্কের সেতু, যেখানে কোনো লোকদেখানো বা প্রদর্শনীর অবকাশ থাকে না।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামি গবেষক
