উভয় জগতের নিরাপত্তায় যা করতে হবে

মসজিদে নববির জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. আলী ইবনে আবদুর রহমান আল-হুজাইফি মুসল্লিদের তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা লাভের মূল উপায় হলো আল্লাহভীতি, বিশুদ্ধ ইমান ও নেক আমল। পূর্ণাঙ্গ ইমান ও শিরকমুক্ত জীবন মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অন্যদিকে গুনাহ, জুলুম ও অবিচার মানুষের জীবন থেকে নিরাপত্তা দূর করে দেয়।

শায়খ বলেন, আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। তবেই আপনারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভে ধন্য হবেন। ইসলাম পৃথিবীতে কেবল আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে এবং এই ইবাদতের ভিত্তি ও নিয়মগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসলাম বর্ণনা করেছে সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর কী কী অধিকার রয়েছে, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কী অধিকার রয়েছে এবং বান্দাদের একে অপরের ওপর কী অধিকার রয়েছে। যাতে একজন মুসলিম আল্লাহর এমন বান্দা হতে পারে, যার সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে, তারা নবি, সিদ্দিক, শহীদ এবং নেককার লোকদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন তারা কতই না উত্তম সঙ্গী! (সুরা নিসা ৬৯)

মুফাসসিররা বলেছেন, সৎকর্মশীল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক আদায় করে। এমন ব্যক্তিই নামাজের তাশাহুদে মুসল্লিদের এই দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়, ‘আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সলিহিন।’ অর্থাৎ ‘আমাদের ওপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। আর পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা নিসা ৩৬)

মুফাসসিররা একে আয়াতুল হুকুক তথা অধিকারের আয়াত বলে অভিহিত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘নবি মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক প্রিয়।’ (সুরা আহজাব ৬) আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’ (সুরা আনফাল ১)

পৃথিবীতে ইসলামের বার্তা এসেছে নিরাপত্তা, শান্তি ও রহমত প্রতিষ্ঠার জন্য। এই দ্বীন মানুষের নিরাপত্তার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম ইমানের বুনিয়াদ স্থাপন করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা ইমান এনেছে এবং তাদের ইমানকে জুলুমের (শিরক) সঙ্গে মিশ্রিত করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম ৮২)

সুতরাং যে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ইমান অর্জন করবে এবং ইমানকে জুলুমের সঙ্গে মিশ্রণ করবে না অর্থাৎ সব ধরনের শিরক থেকে এবং গুনাহের মাধ্যমে নিজের ওপর জুলুম ও বান্দার ওপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকবে, তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ণ নিরাপত্তার ওয়াদা রয়েছে, যা কখনো খেলাফ হবে না। আর যার ইমানে ঘাটতি থাকবে এবং কোনো বান্দার ওপর বা নিজের ওপর জুলুম করবে, তার তাওহিদের ঘাটতি অনুযায়ী দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা ও সুখ কমে যাবে।

মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মুমিন পুরুষ বা নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, আমি তাকে অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব’ (সুরা নাহল ৯৭)

আল্লাহ যখন কোনো জনপদকে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি দান করেন, তখন সেখানে দ্বীন প্রকাশ্য ও শক্তিশালী হয়। মানুষের ব্যবসায়-বাণিজ্য, স্বার্থ ও কল্যাণ সুসংহত হয়। মানুষ তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা পায়। নগরায়ণ ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়, পথঘাট নিরাপদ হয়, শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসের আদান-প্রদান সহজ হয়। এতে জীবনযাত্রা সহজ হয়, সচ্ছলতা আসে, সম্পদের প্রাচুর্য ঘটে এবং মানুষের মনে প্রশান্তি আসে। নিরাপত্তা থাকলে সব ধরনের কল্যাণ একত্রিত হয়। আর নিরাপত্তার অভাব হলে সব ধরনের অকল্যাণ জেঁকে বসে। নিরাপত্তা হলো ইসলামের পূর্ণতার অংশ। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই এই দ্বীনকে পূর্ণতা দান করবেন। এমনকি একজন আরোহী সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে, সে আল্লাহ এবং তার মেষের ওপর নেকড়ের ভয় ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবে না।’ (সহিহ বুখারি) ইসলামের শুরুর দিকে নবিজির জীবদ্দশায় এটি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়েছিল।

হে মুসলিম সমাজ! আপনারা অতি মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় দিন ও সময়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। সুতরাং এ সময়ে নেক আমল করুন এবং মৃত্যু আসার আগেই সাধ্যমতো ইবাদত দিয়ে নিজেদের পরকালের পাথেয় গুছিয়ে নিন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের কল্যাণের জন্য যা কিছু অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে আরও উত্তম এবং মহাপুরস্কার হিসেবে পাবে। আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল ২০)

হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আপনি সুস্থ ও কাজ করার সামর্থ্য রাখেন, ততক্ষণ পরকালের জন্য কাজ করুন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘এমন দুটি নেয়ামত রয়েছে, যে বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধোঁকায় পতিত। তা হলো সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিজ বাসস্থানে নিরাপদ অবস্থায় সকালে ঘুম থেকে জাগল, যার শরীর সুস্থ এবং যার কাছে সেই দিনের খাবার আছে, তাকে যেন গোটা পৃথিবীটাই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি)

৮ মে শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান