২ হাজার টাকা থেকে ১ কোটি

‘দুই টাকার ব্যবসা দিয়ে কী হবে? এর চেয়ে বড় কোনো চাকরি করো অথবা বিদেশে যাও।’ মধ্যবিত্ত পরিবারের আর দশটা তরুণের মতো ২১ বছর বয়সী এক যুবককেও শুনতে হয়েছিল এমন কথা। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। যে ব্যবসাকে একসময় ‘দুই টাকার ব্যবসা’ বলে অবহেলা করা হয়েছিল, সেই ব্যবসাই গত এক বছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বিক্রয় মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের একজন তরুণ উদ্যোক্তার বাস্তব জীবনযুদ্ধের জয়গান।

শুরুর অনুপ্রেরণা ও পারিবারিক বাধা : সবকিছুর শুরু হয়েছিল রাত ২টার সময় দেখা একটি ইউটিউব পডকাস্ট থেকে। সেখানে ১৮ বছরের এক কিশোরের মাসে ৭-৮ লাখ টাকা আয়ের গল্প দেখে অনুপ্রাণিত হন ২১ বছর বয়সী এই তরুণ। তার মনে প্রশ্ন জাগে  সে যদি পারে, তবে আমি কেন নয়? তাও আবার নিজের দেশে থেকে।

তবে যাত্রাটা সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল পরিবারকে বোঝানো। বাইরে মানুষকে বোঝানো সহজ হলেও নিজের বাবাকে ব্যবসার ফিউচার সম্পর্কে আশ^স্ত করা ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। শেষমেশ টিউশনির জমানো ১০-১৫ হাজার টাকা এবং পরিবারের ওপর কিছুটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে সামান্য পুঁজিতে নামেন এই অনিশ্চিত পথে।

জীবনের ঝুঁকি ও ভালোবাসার সাহস : ২১ বছর বয়সে যেখানে অনেকেই ক্যারিয়ার নিয়ে দিশেহারা থাকে, সেখানে তিনি বিয়ে করেন এবং নিজের ১৯ বছর বয়সী স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন এক নতুন পথচলা। শুরুতে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ে তিন মাসে মাত্র ৩০০ টাকা আয় করে হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি। স্ত্রী এবং মায়ের সমর্থন ছিল তার মূল শক্তি। মা, স্ত্রী এবং পরবর্তী সময় ছোট ভাইয়ের সহযোগিতা নিয়ে তিনি একাই সামলেছেন প্রোডাক্ট সোর্সিং, প্যাকেজিং, ডেলিভারি এবং কনটেন্ট তৈরির সব কাজ।

৪টি প্রোডাক্ট থেকে দেশব্যাপী পরিচিতি : নিজের ব্যবহার করা মাত্র ৪টি গ্যাজেট আইটেম দিয়ে ফেসবুকে একটি পেজ শুরু করেন তিনি। প্রাথমিক স্টক ছিল মাত্র ৫ হাজার টাকার। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কাস্টমারের বিপুল সাড়া এবং প্রথম লটেই ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা লাভ তাকে মোটিভেটেড করে। সেই ২ থেকে ৪, ৪ থেকে ১৬ এভাবেই জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে তার ব্যবসার পরিধি।

২ হাজার থেকে ১ কোটির স্বপ্ন ছোঁয়া : গত এক বছরে ‘বাঁধন্স ওয়ার্ল্ড মোট ১ কোটি ১০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। বর্তমানে তাদের স্টকে প্রায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার চায়না থেকে ইম্পোর্ট করা প্রিমিয়াম গ্যাজেট রয়েছে। নিজের শোবার ঘরের পাশের কিচেন রুমটিকেই এখন স্টকরুম হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেখানে প্রতিটি কার্টনে রয়েছে লক্ষাধিক টাকার পণ্য।

বাঁধন্স ওয়ার্ল্ডের সিগনেচার গ্যাজেট কালেকশন : ছোটবেলা থেকেই গ্যাজেটের প্রতি নেশা থাকায় তিনি ট্রেন্ডি এবং ইউনিক সব কালেকশন নিয়ে কাজ করছেন। তার সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য কিছু গ্যাজেট হলো :

 জেলিফিশ হিউমিডিফায়ার ও স্পিকার : এটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এতে সাউন্ড বক্সের সুবিধাও রয়েছে।

ভল্কানো হিউমিডিফায়ার : যা থেকে আগ্নেয়গিরির মতো ধোঁয়া বের হয় এবং ঘরকে সুগন্ধে ভরিয়ে দেয়।

রেইনবক্স (Rainbox) : ছাতার মতো দেখতে এই ডিভাইসটি থেকে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ এবং সুন্দর ঘ্রাণ বের হয়, যা অনিদ্রা দূর করতে সাহায্য করে।

নতুনদের জন্য বার্তা : দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে তার পণ্য। এই তরুণ উদ্যোক্তার গল্প আমাদের শেখায় যে, সম্মান এবং টাকা ইনকাম করার জন্য বিদেশ যাওয়া জরুরি নয়; যদি সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং পরিবারের অন্তত একজনের সমর্থন সঙ্গে থাকে। যে স্বপ্ন ২ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা আজ কোটি টাকার সফলতায় রূপান্তরিত।