ফাস্ট বোলার থেকে উদ্ভাবক

রাইসুল ইসলামের স্বপ্নের ইনিংস

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৮ এএম

বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন ছিল রাইসুল ইসলামের। হাতে বল, চোখে আগুন আর গতির ওপর আস্থা নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছিলেন একজন ফাস্ট বোলার হওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে ক্রিকেট থেকে তার সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়নি। বরং খেলোয়াড় হিসেবে শুরু হওয়া যাত্রাই একদিন তাকে নিয়ে যায় উদ্ভাবনের এক নতুন জগতে।

টেপ-টেনিস ক্রিকেটের গলি থেকে শুরু করে গ্রামীণফোন পেস বোলার হান্ট, এরপর ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট প্রতিটি ধাপেই ছিল একজন গতিময় বোলার হয়ে উঠার চেষ্টা। নিজের সামর্থ্য প্রমাণের সেই লড়াইয়ের মধ্যেই উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। নতুন দেশ, নতুন জীবন, নতুন ব্যস্ততা তবু ক্রিকেটকে কখনো দূরে সরিয়ে রাখেননি।

২০১৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট লিগে নিয়মিত খেলেছেন রাইসুল। অংশ নিয়েছেন ইউএসএ ন্যাশনাল ক্রিকেট ট্রায়ালেও। আমেরিকান প্রিমিয়ার লিগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার রাকিম কর্নওয়ালকে আউট করার ঘটনাও তাকে এনে দেয় স্থানীয় ক্রিকেট অঙ্গনে পরিচিতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় জীবনের সমীকরণ।

চাকরি, পরিবার এবং ক্রিকেট সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে একসময় উপলব্ধি করেন, একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছানো হয়তো আর সম্ভব নয়। তখন তিনি নিজেকে একটি নতুন প্রশ্ন করেন ক্রিকেট তার কাছ থেকে কী নিয়েছে, সেটি নয়; বরং তিনি ক্রিকেটকে কী ফিরিয়ে দিতে পারেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়।

তরুণ ফাস্ট বোলারদের প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে রাইসুল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেন। আধুনিক পেস বোলিংয়ে কবজির সঠিক অবস্থান (Wrist Position) এবং সিম নিয়ন্ত্রণ (Seam Control) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এগুলো অনুশীলনের জন্য কার্যকর প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। একজন খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাই তাকে নতুন কিছু তৈরির পথে নিয়ে যায়।

নিজের দীর্ঘদিনের খেলার অভিজ্ঞতা, কোচিং জ্ঞান এবং গবেষণার সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেন NextGen Wrist TrainerÑ  ফাস্ট বোলারদের কবজির অবস্থান ও সিম কন্ট্রোল উন্নত করার জন্য তৈরি একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম।

এই উদ্ভাবনের পথ অবশ্য সহজ ছিল না। অসংখ্য নকশা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রোটোটাইপ তৈরির পর অবশেষে পণ্যটি পৌঁছে যায় স্থানীয় বোলারদের হাতে। তাদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই রাইসুলকে দেয় আরও বড় পরিসরে কাজ করার আত্মবিশ্বাস।

২০২৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে সফট লঞ্চের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে NextGen Cricket Gearsএরপর জ্যামাইকায় কোচ ও খেলোয়াড়দের সামনে পণ্যটির প্রদর্শন এবং নিউ ইয়র্কের বাফেলোতে প্রথম পাবলিক লঞ্চের মাধ্যমে এটি ক্রিকেট অঙ্গনে পরিচিতি পেতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে এই প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের অর্ডার।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেট (গখঈ)-এর বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিয়ে রাইসুল তার উদ্ভাবিত রিস্ট ট্রেইনার তুলে ধরেছেন শত শত খেলোয়াড়, কোচ, অভিভাবক ও ক্রিকেটপ্রেমীর সামনে। যে ধারণার শুরু হয়েছিল একটি স্কেচবুকের পাতায়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্প্রদায়ের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। রাইসুল ইসলামের কাছে সাফল্যের অর্থও এখন বদলে গেছে।

বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার স্বপ্ন হয়তো পূরণ হয়নি, কিন্তু তার বিশ্বাস ভবিষ্যতের কোনো ফাস্ট বোলার যদি তার তৈরি একটি সরঞ্জামের মাধ্যমে আরও ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে, সেটিই হবে তার ক্রিকেট-জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

কারণ ক্রিকেটে অবদান রাখার পথ শুধু মাঠের বাইশ গজেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো একজন খেলোয়াড়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসটি শুরু হয় মাঠের বাইরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত