জান্নাতুল ফেরদৌসের অনুকরণীয় গল্প

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৫ এএম

‘মানুষের কটু কথা আমি কানে নিইনি। সেগুলোকে নিজের জেদ বানিয়েছি। কাজের মাধ্যমেই সব কটু কথার জবাব দিয়েছি।’

ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক টানাটানিতে সেই স্বপ্ন মাটিচাপা পড়ে। বাবার চাকরিটাও খুব বড় ছিল না। সেই কারণে পরিচিতদের কাছে অপমান সহ্য করতে হয়েছে। পরে চাকরি করতে গিয়েও শুনতে হয়েছে বসের বিষাক্ত কথা।

কিন্তু জান্নাতুল ফেরদৌস দমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। অপমানকে তিনি নিজের আসল শক্তি বানিয়েছেন। সেই শক্তিকে সম্বল করে আজ তিনি এক সফল উদ্যোক্তা। সফলভাবে পরিচালনা করছেন পরিবেশবান্ধব ক্যাফে ‘ওরেন্ডা অ্যান্ড বিন্স’।

ঢাকার মিরপুরের এক সাধারণ পরিবারে জান্নাতুলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা শেষ করে তিনি একটি আন্তর্জাতিক এনজিওতে যোগ দেন। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতেন। সেখানেও সমাজের মানুষের অহেতুক কথা শুনতে হয়েছে। মানুষ বলত, নিজেরই চলার সামর্থ্য নেই আবার অন্যের উপকার কিসের। চাকরি ছাড়ার সময় সাবেক বসও খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন, চাকরি ছেড়ে এখন কি রাস্তায় ঘুরবে?

জান্নাতুল মুখে কোনো জবাব দেননি। তিনি মনে মনে শক্ত সংকল্প করেছিলেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের পথ নিজে তৈরি করবেন।

মায়ের হাতের রান্না ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো লাগত। জান্নাতুল নিজেও বেকিং ভালোবাসতেন। কেক আর পুডিং বানাতেন চমৎকার। মনের মধ্যে সবসময় একটা নিজস্ব রেস্টুরেন্টের স্বপ্ন উঁকি দিত।

এক শুভাকাক্সক্ষী বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় অবশেষে শুরুটা হয়। মিরপুর ১০ নম্বরে ছোট একটি রেস্টুরেন্ট খোলেন। প্রথম দিকে শেফ ও কর্মী নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। জান্নাতুল নিজে শেফের পাশে বসেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে রেসিপি তৈরি করেছেন। সেই ছোট উদ্যোগই আজকের জনপ্রিয় ক্যাফে ‘ওরেন্ডা অ্যান্ড বিন্স’। ঢাকা শহরে ব্যস্ততা আর জ্যামের শেষ নেই। মানুষ একটু শান্তির জায়গা খোঁজে। সেই শান্তির ছোঁয়া দিতেই ক্যাফেটি সাজানো হয়েছে। পুরো ক্যাফেজুড়ে আছে প্রচুর সবুজ গাছপালা।

এই ক্যাফের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এটি পরিবেশবান্ধব। ক্যাফের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ আসে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। এসি ও কিচেনের বড় বড় যন্ত্রপাতি সোলারেই চলে। এমনকি বিদ্যুৎ চলে গেলেও ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সৌরবিদ্যুতে ক্যাফে একদম স্বাভাবিক থাকে। এতে একদিকে যেমন খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে।

জান্নাতুল ব্যবসায় শতভাগ সততায় বিশ্বাস করেন। তাদের ক্যাফেতে অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে লাইভ কিচেন। রান্নার পুরো প্রক্রিয়া সবাই চোখের সামনে দেখতে পান। জান্নাতুলের স্পষ্ট নীতি হলো, তিনি নিজে যা খেতে পারবেন, কেবল সেটাই অতিথিকে পরিবেশন করবেন।

তিনি নিজেকে একজন কাজপাগল মানুষ মনে করেন। দিনে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেও তার কোনো ক্লান্তি নেই। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নিজে ক্যাফিতে উপস্থিত থাকেন এবং অতিথিদের দেখভাল করেন। আজ জান্নাতুল ফেরদৌস সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায় শক্ত এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের নানা বাধা পেরিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের পরিচিতি। তবে তিনি এখানেই থেমে যেতে চান না। সামনে ‘ওরেন্ডা অ্যান্ড বিন্স’ শাখা আরও বড় করার ইচ্ছা তার। পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করা এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়েও বড় কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যের কথায় ভেঙে না পড়ে কীভাবে পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হয়, জান্নাতুল ফেরদৌসের এই পথচলা আজ আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত