প্রবাসে বাড়ছে ‘পেইড সম্মাননা’ সংস্কৃতি

একসময় প্রবাসী সমাজে সম্মাননা, ক্রেস্ট, অ্যাওয়ার্ড কিংবা গুণীজন সংবর্ধনা ছিল সমাজে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম। সমাজসেবক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী, ব্যবসায়ী কিংবা মানবিক কাজে যুক্ত প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অবদানকে স্বীকৃতি দিতেই আয়োজন করা হতো এসব অনুষ্ঠান।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংস্কৃতির একটি অংশ এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, আর সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স বাংলাদেশ কমিউনিটিতে তথাকথিত “পেইড অ্যাওয়ার্ড” বা অর্থের বিনিময়ে সম্মাননা দেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই আলোচনায় আসছে।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে “ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স”, “গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড”, “ডায়াসপোরা অনার”, “এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড” কিংবা “লিডারশিপ সম্মাননা” শিরোনামের রঙিন পোস্টার। জমকালো হলরুম, আলোকসজ্জা, ব্যানার, অতিথি তালিকা আর আকর্ষণীয় প্রচারণায় ভরপুর এসব আয়োজন দেখে বাহ্যিকভাবে অনেক বড় ও মর্যাদাপূর্ণ মনে হলেও, এর পেছনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কমিউনিটির সচেতন মহল।

কমিউনিটির একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, এখন অনেক অনুষ্ঠানে প্রকৃত অবদানের চেয়ে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কোথাও স্পন্সর ফি, কোথাও টেবিল চার্জ, কোথাও আবার ডোনেশন বা সদস্য ফি’র বিনিময়ে সম্মাননা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ কে সমাজের জন্য কী কাজ করেছেন, তার চেয়ে কে কত অর্থ দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠছে মূল বিবেচ্য বিষয়।

ফ্রান্স বাংলাদেশ কমিউনিটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা কিছু নামসর্বস্ব সংগঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সংগঠনের সারা বছরের দৃশ্যমান কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা মানবিক কার্যক্রম না থাকলেও বছরে একবার জাঁকজমকপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজনই যেন তাদের প্রধান কাজ। কোনো কোনো সংগঠন শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তাদের কার্যক্রমও অনেকটা অদৃশ্য হয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সম্মাননা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে। আন্তর্জাতিক মানের কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণত থাকে নিরপেক্ষ জুরি বোর্ড, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই এবং অবদানের বিস্তারিত মূল্যায়ন। কিন্তু ফ্রান্সের প্রবাসী কমিউনিটির কিছু অনুষ্ঠানে সেই কাঠামোর কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই বলেই অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সচেতন মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় যাদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, তারা কী অবদানের জন্য পুরস্কৃত হচ্ছেন সেটিরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকে না। নেই কোনো লিখিত মূল্যায়ন বা নির্দিষ্ট মানদণ্ড। ফলে পুরো বিষয়টি অনেকের কাছে “স্টেজ সোয়াপ” সংস্কৃতি হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থাৎ আয়োজক পক্ষ অর্থ পেয়ে সন্তুষ্ট, আর সম্মাননা গ্রহণকারী ব্যক্তি মঞ্চে উঠে ছবি তুলে সামাজিক মর্যাদার অনুভূতি অর্জন করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই ব্যবহার করছে কিছু বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম। প্রবাসে নিজের পরিচিতি বাড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার পাওয়া কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়ানোর আগ্রহ থেকেই অনেকে এসব অনুষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছেন। আর সেই সুযোগকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে এক ধরনের “সম্মাননা বাণিজ্য”।

এমন বাস্তবতায় প্রকৃত সমাজকর্মী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা মানবিক কাজে নিরবে কাজ করা মানুষদের মূল্যায়নও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ যিনি বছরের পর বছর কমিউনিটির জন্য কাজ করছেন, তার সঙ্গে একই মঞ্চে অর্থের বিনিময়ে সম্মাননা পাওয়া কাউকে দাঁড় করালে প্রকৃত সম্মাননার মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হয়।

তবে সব আয়োজনকে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না। ফ্রান্সে এখনও অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সংগঠন আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তারা নিরবে কমিউনিটির উন্নয়ন, প্রবাসীদের অধিকার এবং মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু কিছু প্রশ্নবিদ্ধ আয়োজন পুরো অঙ্গনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সচেতন মহল বলছে, এখন সময় এসেছে প্রবাসী সমাজের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার। যেকোনো সম্মাননা প্রদানের আগে আয়োজকদের গ্রহণযোগ্যতা, পরিষ্কার নির্বাচন প্রক্রিয়া, জুরি বোর্ড এবং মূল্যায়নের মানদণ্ড প্রকাশ করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রবাসীদেরও বুঝতে হবে, সম্মাননা তখনই মর্যাদাপূর্ণ হয়, যখন তা আসে কাজের স্বীকৃতি থেকে; অর্থের বিনিময়ে নয়।

প্রশ্ন এখন একটাই, প্রবাসে বাড়তে থাকা এই অ্যাওয়ার্ড সংস্কৃতি কি সত্যিই গুণী মানুষদের সম্মানিত করছে, নাকি ধীরে ধীরে তৈরি করছে নতুন এক সামাজিক মর্যাদা-বাণিজ্যের বাজার?