ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবে ফ্রান্সে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। দেশের ৯৬টি বিভাগের মধ্যে ৩৫টিতে সর্বোচ্চ স্তরের ‘রেড হিটওয়েভ অ্যালার্ট’ এবং আরও ৬০টি বিভাগে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে।
শনিবার জরুরি বৈঠক শেষে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানান, চরম তাপমাত্রার মধ্যে জনসমাগমে অ্যালকোহল সেবন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে জননিরাপত্তার স্বার্থে উন্মুক্ত অনুষ্ঠান ও উৎসবগুলোতে সাময়িকভাবে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রবিবার দেশব্যাপী উদযাপিত জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘ফেতে দ্য লা মিউজিক’ (সংগীত উৎসব) চলাকালে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
ফরাসি আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্যারিস অঞ্চল এবং বারগান্ডি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। কিছু স্থানে তা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে শরীর দ্রুত পানি হারায়। এ অবস্থায় অ্যালকোহল গ্রহণ করলে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে অবস্থানরত মানুষের জন্য এই ঝুঁকি বেশি।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানগুলো সার্বক্ষণিক খোলা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বয়স্ক, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা প্রবাসীদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, শিশু, কিশোর এবং শ্রমজীবী মানুষেরা এ ধরনের তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
কমিউনিটি নেতারা বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, ডেলিভারি কর্মী এবং খোলা পরিবেশে কর্মরত ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময় কাজ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অভিভাবকদের উদ্দেশে তারা বলেন, শিশুদের কখনোই বন্ধ গাড়ি বা অতিরিক্ত গরম কক্ষে একা রাখা উচিত নয়। মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মাহবুবুর রহমান বলেন, তাপপ্রবাহ এখন শুধু আবহাওয়াগত চ্যালেঞ্জ নয়, এটি একটি মানবিক সংকটেও পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং অভিবাসী পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়েও সমন্বিত সচেতনতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
এদিকে জরুরি সেবা, হাসপাতাল এবং দমকল বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। বিভিন্ন শহরে শীতল আশ্রয়কেন্দ্র ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।