বর্তমান সময়ে স্টেরয়েডের বহুল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। স্টেরয়েড হলো কৃত্রিমভাবে তৈরি কর্টিসল যা শরীরের প্রদাহ (Inflammation) কমাতে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে কাজ করে। যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগের প্রদাহ সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। স্টেরয়েডকে বলা হয়ে থাকে ম্যাজিক ড্রাগ।
স্টেরয়েডের ব্যবহার : রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস- বাতরোগ, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি রোগ, নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম (কিডনি রোগ) চর্মরোগ বা মারাত্মক অ্যালার্জি, লুপাস ও অন্যান্য কিছু রোগে সংকটাপন্ন ব্যক্তির রোগ লক্ষণ কমাতে ওষুধ হিসেবে চিকিৎসকরা অনেক সময় স্টেরয়েড প্রেসক্রাইব করে থাকেন।
এটা দেওয়া হয় খুব কম সময়ের জন্য। এরপর তা দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু কিছু রোগে দীর্ঘদিন দিতে হয়, সে ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে মাত্রাটা কমিয়ে তারপর বন্ধ করা হয় । দীর্ঘ সময় দিতে হলে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তের গ্লুকোজ ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হয় এবং সঙ্গে হাড়ক্ষয় প্রতিরোধের ওষুধ দেওয়া হয়।
স্টেরয়েডের অপব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বা অতিরিক্ত মাত্রায় স্টেরয়েড ব্যবহার যা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
১. অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে বা অন্যের পরামর্শ মতো ওষুধ খাওয়া।
২. চিকিৎসক অল্প সময়ের জন্য খেতে বলেছেন সঙ্গে অন্য ওষুধও দিয়েছেন কিন্তু রোগীর কাছে স্টেরয়েভ বেশি কার্যকর মনে হয় তাই ঐ ওষুধ অনেকদিন ধরে খান কিন্তু চিকিৎসকের কাছে যেতে অবহেলা করেন।
৩. দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন হাঁপানি, বাত রোগ-রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি কষ্টদায়ক রোগে ধৈর্য হারিয়ে হাতুড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে না বুঝে ওষুুধ সেবন করেন যায় মধ্যে স্টেরয়েড মেশানো থাকে।
৪. শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে অনেক দিন ধরে লেবেলবিহীন কৌটার ওষুধ সেবন করা।
৫. বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে অতি দ্রুত আরোগ্য লাভের আশায় ভুল ওষুধ সেবন করা।
৬. চর্মরোগের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন যাবৎ স্ট্রেরয়েড মলম ব্যবহার করা।
স্টেরয়েডের অপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া : ১. হাড়ের ক্ষতি : দীর্ঘদিন ব্যবহারে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায় বা অস্টিওপোরোসিস হয়।
২. রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে ডায়াবেটিস হতে পারে, রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, পাকস্থলীতে আলসার হতে পারে।
৩. শারীরিক গঠনের পরিবর্তন : মুখম-ল চাঁদের মতো গোল হয়ে যাওয়া (Moon face), ওজন দ্রুত বৃদ্ধি, চামড়া ফেটে যাওয়া এবং শরীর ফুলে যাওয়া এবং শরীরে মেদ জমতে থাকা, চামড়া পাতলা, হাত ও পা চিকন ও জোর কমে আসা।
৪. সংক্রমণ ঝুঁকি : রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় যেকোনো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
৫. মানসিক সমস্যা : মেজাজ পরিবর্তন, আগ্রাসী আচরণ, এমনকি বিষণœতা দেখা দিতে পারে।
অন্যান্য : ব্রণ হওয়া, অনিদ্রা এবং চুল পড়ে যাওয়া, চোখে ছানি পড়া ইত্যাদি।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড গ্রহণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এটি শরীরের স্বাভাবিক হরমোন ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে।
৬. সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা সেকেন্ডারি অ্যাড্রিনাল ইনসাফিসিয়েন্সি অনেক দিন স্টেরয়েড গ্রহণ করার কারণে পিটুইটারি গ্রন্থি পর্যাপ্ত অঈঞঐ হরমোন তৈরি করে না, ফলে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে প্রয়োজনীয় কর্টিসল হরমোন নিঃসৃত হয় না। দীর্ঘসময় ধরে কর্টিকোস্টেরয়েড ওষুধ সেবন করে হঠাৎ বন্ধ করে দিলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
লক্ষণ : অতিরিক্ত দুর্বলতা বা ক্লান্তিবোধ, ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমিভাব, মাথা ঘোরা, ওজন কমে যাওয়া, এবং রক্তে শর্করা বা সুগারের মাত্রা কমে যাওয়া।
চিকিৎসা : চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হরমোনের মাত্রা নির্ণয় করে যথাযথ হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দেওয়া হয়।
সতর্কতা : সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি অ্যাড্রিনাল সংকট (Adrenal Crisis) নামক জীবন-হুমকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
১. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা।
২. স্টেরয়েড কোনো সাধারণ ওষুধ নয়। এটি শুধুমাত্র নিবন্ধিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যবহার করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর ব্যবহার জীবনঘাতী হতে পারে।